ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম জাতীয় শিক্ষাক্রম থেকে ভিন্ন হওয়ায় তাদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র করা হচ্ছে, যাতে তাদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ সহজ হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে একই ইউনিটে ভর্তি হতে যাওয়া সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান প্রতিযোগিতা ও অভিন্ন মেধাক্রম কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশ গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
২ আগস্ট ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ও সময়সূচি প্রকাশের সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর আগে জুলাই মাসের শুরুতে বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনার কথা জানা গিয়েছিল। আগামী ১১ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে ভর্তি আবেদনের প্রক্রিয়া। বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১২ ডিসেম্বর। এই ইউনিটের অধীনে বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ফার্মেসি, পৃথিবী ও পরিবেশবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন অনুষদ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ও কারিকুলামগত জটিলতা দূর করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, কাউকে বাড়তি সুবিধা দেয়া নয়, বরং বৈষম্য দূর করাই এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য। তিনি আরও জানান, ডিনস কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া এগিয়েছে এবং পরবর্তীতে একাডেমিক কাউন্সিলে এর অনুমোদন নেয়া হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও প্রো-ভিসিরা মনে করছেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে যথাযথ ফোরাম অর্থাৎ একাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম তালুকদার এই উদ্যোগের সমালোচনা করে জানিয়েছেন, তাদের একাডেমিক কমিটিতে আলাদা প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে জাতীয় ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রম মিলিয়ে একটি সমন্বিত প্রশ্নপত্র তৈরির সুপারিশ করা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, আলাদা প্রশ্নপত্র হলে দুই ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মানদণ্ড একই রাখা কঠিন হবে। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানও অভিন্ন মেধাক্রম তৈরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কা করছেন। তবে একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মামুনুর রশীদ মনে করেন, প্রশ্নপত্র তৈরির নীতিমালাটি কেমন হয়, তার ওপরই এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে।
এদিকে ইংরেজি মাধ্যমের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একই দাবির প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য কমাতে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আলাদা প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্তকে অনেকে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।
এর সাথে জাতীয় পর্যায়ের সাম্প্রতিক শিক্ষানীতির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আবশ্যিক ও সাধারণ বিষয়গুলোর পরীক্ষা একই দিনে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি, অভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য কমানো সম্ভব।





