মহাসড়কে দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগ জরুরি

প্রকাশ:

জনগণের করের টাকায় নির্মিত মহাসড়ক প্রশস্ত করার মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মহাসড়কগুলো চার বা ছয় লেনে উন্নীত হলেও রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দোকানপাট ও পরিবহন স্ট্যান্ডের দখলের কারণে কার্যকর লেনের সংখ্যা দুই বা তিন লেনে নেমে আসছে। এটি কেবল প্রকৌশলগত ও অর্থনৈতিক অপচয়ই নয়, বরং উন্নয়নের সুফল পাওয়ার পথে একটি বড় বাধা। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপুল বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সুশাসন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব প্রকট।

দেশের সড়ক অবকাঠামো আজ এক গভীর সংকটের মুখে। রাস্তা চওড়া হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন অপরাধী সিন্ডিকেট, এক শ্রেণির শ্রমিক নেতা ও দখলদার চক্র সেখানে চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। হকার, সিএনজি, রিকশা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ দখলে থাকা এসব সড়ক জনদুর্ভোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, পরিবহন খাত ও সড়কপথের চাঁদাবাজি থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়, যেখানে একজন হকার থেকে শুরু করে সিএনজি চালক পর্যন্ত দৈনিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে বাধ্য হন। এই অর্থ থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে বণ্টিত হয়।

মহাসড়কে সিএনজি ও ছোট যানের চলাচল আইনত নিষিদ্ধ হলেও ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতির কারণে এগুলো নিয়মিত চলাচল করছে। স্থানীয় পুলিশ ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটকে মাসিক বা সাপ্তাহিক ‘টোকেন’ ফি দিয়ে চালকরা মহাসড়কে নিজেদের অবস্থান বৈধ করে নিয়েছেন। ভারী যানবাহনের ভিড়ে ধীরগতির এসব ছোট যান প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে; বিশেষ করে ৮০-১০০ কিলোমিটার গতির বাসের সামনে সিএনজির আকস্মিক উপস্থিতি বা লেন পরিবর্তন অত্যন্ত ভয়াবহ, যেখানে যাত্রী ও চালকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকে। অতীতে শ্রমিক নেতাদের রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই সংকট নিরসনে কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং একটি টেকসই কাঠামো প্রয়োজন। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো চাঁদাবাজিতে অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থে নিজস্ব জমিতে স্ট্যান্ড নির্মাণ করতে পারে। এছাড়া সরকার অব্যবহৃত খাসজমি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিবহন স্ট্যান্ডের জন্য লিজ দিতে পারে। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ‘পরিবহন শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কোনো সড়কের দখলদারত্বের জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক ইনচার্জ বা থানার কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সড়কের পাশে সব ধরনের অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে দখলদারদের শনাক্ত করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের মহাসড়ক নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন