প্রতি বছর ২৭ জুলাই বিশ্ব হেড-নেক ক্যান্সার দিবস পালিত হয়। মাথা ও ঘাড়ের রোগ নিরাময়ে বিভিন্ন চিকিৎসা শাখার একযোগে কাজ করার এটি একটি অনন্য সুযোগ। এর মূল লক্ষ্য হলো সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা জোরদার এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা। ২০১৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হেড নেক অনকোলজিক সোসাইটিজ (আইএফএইচএনওএস) এই দিবসটি নির্বাচন করে এবং এখন থেকে দিবসটিকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হবে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই নিউইয়র্কে বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা মাইকেল ডগলাস আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
আইএফএইচএনওএস হলো বিশ্বের সকল দেশের হেড-নেক ক্যান্সার সোসাইটিগুলোর সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম, যার সাথে ৫৫টি সোসাইটি, ৫১টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং ১৭৩টি দেশের ১২০১টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত ইউআইসিসি (UICC) যুক্ত রয়েছে। এই বছর দিবসটির লক্ষ্য কেবল সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বাস্তবসম্মত ও বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই বৈশ্বিক উদ্যোগের দুটি মূল অংশ রয়েছে। প্রথমত, ৬০-সেকেন্ডের মাথা ও ঘাড় পরীক্ষা, যেখানে ইএনটি, অনকোলজি, ডেন্টিস্ট্রি ও প্রাইমারি কেয়ারের চিকিৎসকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে যেন তারা এই সপ্তাহে আগত সকল রোগীর একটি সংক্ষিপ্ত স্ক্রিনিং সম্পন্ন করেন এবং সেই সংখ্যা লিপিবদ্ধ করেন। দ্বিতীয়ত, রোগীর কণ্ঠস্বর প্রাচীর বা ডিজিটাল ক্যাম্পেইন, যেখানে রোগী ও চিকিৎসকরা তাদের অভিজ্ঞতার গল্প বা সংহতি প্রকাশকারী ছবি শেয়ার করবেন, যা আইএফএইচএনওএস ওয়েবসাইটে একটি মোজাইক হিসেবে প্রদর্শিত হবে।
বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারের ভয়াবহতা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে ক্যান্সারে এবং প্রতি দুইজনের একজন জীবদ্দশায় এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যেখানে পুরুষের সংখ্যা নারীদের দ্বিগুণ। আগামী এক দশকে এ সংখ্যা দেড় কোটিতে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার দুই-তৃতীয়াংশই হবে উন্নয়নশীল দেশে। বাংলাদেশেও ক্যান্সারের ব্যাপকতা উদ্বেগজনক। দেশে আনুমানিক ২০ লাখ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী রয়েছে, প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ এবং মারা যাচ্ছেন প্রায় ১ লাখ। সেই হিসাবে প্রতিদিন দেশে ২৭৩ জন মানুষ ক্যান্সারের মিছিলে যোগ দিচ্ছেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের সর্বশেষ প্রকাশিত (২০১৫-২০১৭) রিপোর্ট অনুযায়ী, পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুস এবং নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার শীর্ষে। হেড-নেক ক্যান্সারের মধ্যে মুখ ও মুখগহ্বর, থাইরয়েড, নাক, সাইনাস, কণ্ঠনালী, গলনালী, শ্বাসনালী, খাদ্যনালী, লালাগ্রন্থি, ত্বক ও লসিকাগ্রন্থির ক্যান্সার অন্তর্ভুক্ত। পুরুষ ও নারীদের প্রথম ১০টি ক্যান্সারের তালিকায় হেড-নেক ক্যান্সারের বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে থাকলেও, এদের সম্মিলিত যোগফল সর্বাধিকের কাছাকাছি। এর বাইরে থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগীদের একটি বড় অংশ প্রথাগত ক্যান্সার হাসপাতালে যান না। নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের থাইরয়েড ডিভিশনের তথ্যমতে, দেশের সব সেন্টারগুলোতে বছরে আনুমানিক ২২০০-২৫০০ রোগী থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীরা থেরাপির প্রয়োজন না হওয়ায় এবং গভীরতর (Advanced) পর্যায়ের অনেক রোগী অবহেলার কারণে এখানে রিপোর্ট করেন না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হেড-নেক ক্যান্সারের চিকিৎসাসেবা দেশে অত্যন্ত অপ্রতুল। অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সুবিধা নেই। সরকারি হাসপাতালে রোগীর ব্যাপক চাপ ও জনবলের অভাব রয়েছে। সারা দেশে এই বিশেষায়িত অপারেশন করেন আনুমানিক মাত্র ২৫ জন চিকিৎসক, অথচ একটি বড় হেড-নেক সার্জারিতে ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগে। বেসরকারি হাসপাতালে এই অপারেশন হলেও খরচ অত্যন্ত বেশি। রেডিওথেরাপির ক্ষেত্রেও সেন্টারের সংখ্যা রোগীর তুলনায় কম হওয়ায় চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়, যা রোগীর সুস্থতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল ৫০ বেড থেকে ধাপে ধাপে উন্নীত হয়ে ৫০০-তে পৌঁছেছে এবং সরকারি উদ্যোগে আটটি বিভাগে ১৪০০ বেডের ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলমান। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ২০১০ সালে হেড-নেক সার্জারি ডিভিশন চালু হয়েছে এবং সম্প্রতি চিকিৎসকদের জন্য এক বছরের ফেলোশিপ চালু করা হয়েছে। তবে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে হেড-নেক ক্যান্সারের চিকিৎসা খুবই সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর। কিন্তু দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, চর্বি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার কমিয়ে ফলমূল ও সবজি বাড়ানো, ধূমপান ও পান-তামাক বর্জন, মদ্যপান পরিহার এবং পরিবেশদূষণ রোধে সচেতন হতে হবে। গলা ফোলা, মুখে ঘা, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, খেতে কষ্ট বা নাকে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।





