বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির নতুন পে-স্কেল ঘোষণার গুঞ্জনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিলেও, দেশের প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ বেসরকারি খাতের শ্রমশক্তি ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। বর্তমানে দেশে সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন, যারা এই নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় পড়বেন। অন্যদিকে, মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে নিয়োজিত, যাদের বেতন বৃদ্ধির কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও প্রকট হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে চাহিদার পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বেতন বৃদ্ধির খবর পেলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেন, যার ভুক্তভোগী হন বেসরকারি খাতের কর্মীরা। তিনি আরও জানান, নতুন পে-স্কেলের অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা নতুন টাকা ছাপাতে হবে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। ড. মাহফুজ কবীরের মতে, সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হলেও এটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন অর্থনীতি সংকটাপন্ন। তিনি সতর্ক করে বলেন, চাহিদা বাড়লে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ইউসুফ আলীর মতো বেসরকারি চাকরিজীবীরা উচ্চমূল্যের বাজারে সাতজনের সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের আয় বাড়ছে না, অথচ সরকারি বেতন বাড়লে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাবে, তখন আমরা বাঁচব কীভাবে? পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বেসরকারি খাতের বেতন না বাড়লে এই দারিদ্র্যের হার আরও বাড়তে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পেনশনসহ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে। তবে এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
সরকার এই ঝুঁকিগুলো স্বীকার করলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পে-স্কেল বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বেতন একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ (২৫০) টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন কমিশনের সদস্যরা। এছাড়া বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার পাশাপাশি যাতায়াত ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার জন্য অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে ঘোষণা করেছেন, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে। এর আগে ২০১৫ সালে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল। অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের আমলে গঠিত বেতন কমিশন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল, যার ভিত্তিতে বিএনপি সরকার একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা মন্ত্রিসভায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাই না করে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।





