বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁয় গত এক দশকে কৃষিব্যবস্থায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। একসময় ধান উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই জেলায় এখন সাপাহার ও পোরশা উপজেলার মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত আমবাগান। এমনকি ৫-৭ বছর আগেও এই অঞ্চলে আমের চাষ এতটা বিস্তৃত ছিল না। ধানসহ অন্যান্য ফসল সরিয়ে আম এখন প্রধান অর্থকরী ফসল হয়ে উঠেছে। এই বাণিজ্যিক রূপান্তরের আড়ালে মুনাফার বণ্টন, ক্ষমতার ভারসাম্য, শ্রমের মূল্যায়ন, কৃষিবৈচিত্র্যের সংকট এবং নারীর নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় নওগাঁ কাটারিভোগ ও কালিজিরাসহ উন্নতমানের চালের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কয়েক বছর আগেও এখানে প্রায় দুই হাজার চালকল বা চাতাল চালু ছিল, যেখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীরা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ করতেন। কিন্তু ধানের জমিগুলো আমবাগানে রূপান্তরিত হওয়ায় চাতালগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে বহু নারী শ্রমিক তাদের কাজের সুযোগ হারাচ্ছেন।
জমির মালিকানার ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। বড় জমির মালিক ও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কৃষকেরাই মূলত আম চাষে এগিয়ে এসেছেন। আবার বাইরে থেকে আসা পুঁজি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী লিজ নিয়ে আমবাগান করছেন। ছোট ও খণ্ডিত জমির মালিকেরা চারপাশের আমবাগানের বিস্তারের ফলে ধান চাষ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে নিজেদের জমি ১০-১২ বছরের জন্য লিজ দিয়ে দিচ্ছেন অথবা আমবাগানে রূপান্তর করছেন। ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা নিজেদের জমিতেই কার্যত ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।
আমবাগান ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের জেন্ডার বিভাজন। স্থানীয় পর্যায়ে আমবাগানের কাজে নারীরা উপযুক্ত নয়—এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া আমবাগানের ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের কারণে তৈরি হওয়া নির্জন পরিবেশে নারীরা যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ভয়ে কাজ করতে অনাগ্রহী হচ্ছেন। দলবদ্ধভাবে কাজ করতে গেলেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ছে এবং মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গবেষক মাসুমা বিল্লাহর মতে, একটি নির্দিষ্ট ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি; যেমন ১৮৪৫-১৮৫২ সালের আইরিশ দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির আলুর একচেটিয়া চাষ, আবার ১৯৪৩ সালের বিখ্যাত বাংলার দুর্ভিক্ষের পেছনেও ছিল যুদ্ধের চাহিদা মেটাতে কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ধানের পরিবর্তে পাটের চাষ। নওগাঁর আমবাগানগুলোতে কীটনাশকের ব্যবহারও একটি সাধারণ বিষয়, যা মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। আমের মৌসুমে কিছু মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হলেও, বছরের বাকি সময়ে এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কর্মহীন থাকে, যা দীর্ঘ মেয়াদে এলাকার খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।




