ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যার ঘটনায় এমপি পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুর সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং খোদ সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের একটি বিতর্কিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় নাটোর-৪ আসনের রাজনীতি এখন চরম অস্থিরতার মুখে। গত ক’দিনের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই খোদ এমপি আবদুল আজিজের আশালীন ভিডিও দৃশ্যত ক্ষোভের আগুলে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এই দুই ইস্যুতে টালমাটাল নাটোরের রাজনীতি। দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে।
গত ১৪ই অক্টোবর রাতে চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হেলমেট পরা দুই যুবকের হামলায় গুরুতর আহত হন গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল (৩২)। দীর্ঘ ১২ দিন ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাতে তিনি মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এমপি আজিজের পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার করে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া মিন্টুকে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। এই হত্যা মামলায় আজিজের পুত্র নুরুজ্জামান মিন্টুকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানা যায়, জীবনহানির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী ও পরে ঢাকা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেয়া হয়।
শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। মঙ্গলবার নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে জানাজা শেষে রাতে গুরুদাসপুরে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেন এমপি আব্দুল আজিজ, তবে উপস্থিত ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় তাকে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেয়। জানাজা শেষ হওয়ার পরপরই কিছু উত্তেজিত জনতা স্থানীয় রাশ আরবান মেগা শপিং মলে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এছাড়া জেলার বড়াইগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এমপির ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন বলে জানা যায়, যার ফলে এমপি পরিবারের অভ্যন্তরে থাকা অভ্যন্তরীণ কোন্দলও আলোচনায় উঠে এসেছে। এমন কি এসময় তিনি নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজার সময় বক্তব্যে নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চান এমপি আব্দুল আজিজ।
এর মধ্যেই প্রবাসী এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের প্রায় পাঁচ মিনিটের তিনটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়লে উত্তাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। ভিডিওতে এমপির আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি ও কথা বলতে দেখা যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা এমপির পদত্যাগ দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তীব্র সমালোচনা ও ধিক্কার জানাচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অনেকেই এখন ট্রল ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করছেন ফেসবুক জুড়ে। আশফাক নামের ওই আইডি থেকে এরইমধ্যে তার বিভিন্ন অপকর্ম ও তার দুই সন্তানের নানা ধরনের অনৈতিক কাজের সমালোচনা করা হচ্ছিল।
নিজের ভিডিও প্রসঙ্গে এমপি আব্দুল আজিজ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ভিডিওটি পুরোপুরি বানোয়াট এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এটি ছড়িয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে শাকিলের মৃত্যুর আগে তার পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ২০শে এপ্রিল নিরাপত্তা চেয়ে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলেন শাকিল এবং এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও জানিয়েছিলেন। তার বাবা রবিউল করিম জানান, শাকিলের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি পুলিশ সে সময় গুরুত্ব সহকারে নেয়নি, এমনকি আহত হওয়ার পরও হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল তারা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল সকালে ফেসবুকে এমপির সঙ্গে এক নারীর অশ্লীলতার ভিডিও প্রকাশ পায়। বিষয়টি এখন এলাকায় টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মান ক্ষুণ্ন্ন করার জন্য এআই প্রযুক্তি দিয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ।





