ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র অসন্তুষ্ট। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার বাবার সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করে এই যুদ্ধের বিষয়ে নিজের উদ্বেগ ও বিরোধিতার কথা জানিয়েছেন। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় ট্রাম্প জুনিয়র চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে না জড়ায়। তার মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশের সংঘাত থেকে দূরে থাকা উচিত।
২০২৪ সালে ইরান যখন ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল, তখন ট্রাম্প জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, ‘মনে আছে, তারা বলেছিল ট্রাম্প আমাদের ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবেন? এমন সময় আমাদের উপলব্ধি করা উচিত, ট্রাম্প, তার শক্তি ও দৃঢ় নেতৃত্বকে পেয়ে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান।’
তবে প্রায় আড়াই বছর পর ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় তার সেই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প জুনিয়র ব্যক্তিগতভাবে বাবার সঙ্গে একাধিকবার ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে তিনি সবসময় সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন এবং মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়া উচিত নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়াত রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের সঙ্গে ট্রাম্প জুনিয়রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যিনিও ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। দ্য আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একটি সূত্র জানান, ‘ডন এই বিষয়ে তার মতামত ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখেছেন। তিনি কখনোই প্রকাশ্যে বাবার সঙ্গে মতবিরোধে যাবেন না। তবে যারা তাকে চেনেন, তাদের কেউই এই বিষয়ে তার ব্যক্তিগত অবস্থান জেনে অবাক হবেন না।’
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভেদ বাড়ছে। এই শিবিরের একাংশ মনে করে, বিদেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একটি সূত্র ট্রাম্প জুনিয়রকে ‘সবচেয়ে বেশি মাগাপন্থী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
শুধু ট্রাম্প পরিবারের মধ্যেই নয়, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করা উচিত কিনা, তা নিয়ে আলোচনার সময় ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া প্রাথমিক প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন করা বাস্তবসম্মত কি না।
এদিকে, ইরান সংঘাত মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান সংঘাত পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তুষ্ট, যেখানে ৩৩ শতাংশ তার পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত নিয়ে মার্কিন জনগণের উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকানদের সমর্থনও কমেছে। মার্চে যেখানে ৬৯ শতাংশ রিপাবলিকান ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, সেখানে তা কমে ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রায় অর্ধেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরান সংঘাত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে, যদিও শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন এ সংঘাতের মেয়াদ চার থেকে ছয় সপ্তাহ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল। সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী ও প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।





