বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও উন্নত ও দ্রুত সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি বিশেষায়িত কান্ট্রি ডেস্ক চালু করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। ঢাকায় আয়োজিত ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডেস্কগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে বেপজার অধীনে থাকা আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) এবং দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে, যার মধ্যে এই তিন দেশ শীর্ষস্থানীয়। নতুন ডেস্কগুলো ওই দেশগুলোর বিদ্যমান ও নতুন উদ্যোক্তাদের তথ্য, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজতর করবে। তার উপস্থাপনায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিক কল্যাণ, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ উঠে আসে। সমাপনী বক্তব্যে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংস্থাটির দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা, তাদের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি বোঝার পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব করে তোলাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বেপজা তাদের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করেছে এবং এই সময়ে বেপজাভুক্ত জোনগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। এছাড়াও চলতি বছরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২, যশোর ইপিজেড এবং পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান, বেপজা ‘থ্রি-আর’ নীতি অনুসরণ করছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সার্কুলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ করছে। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ইনভেস্টরস ক্লাব, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, ফায়ার স্টেশন এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন বিগত অর্থবছরের অর্জন তুলে ধরতে গিয়ে জানান, সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বেপজা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। এছাড়া যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড স্থাপনের অগ্রগতিও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ইপিজেডগুলোর শ্রম পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সংস্থাটি আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রেখে শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করছে। অনুষ্ঠান পরবর্তী উন্মুক্ত আলোচনায় ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক মিলিয়ন পার্ক বাংলাদেশে বিশেষত বেপজা অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিগত প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান। এপিক গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিন্টু কুমার শ যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ ব্যক্ত করেন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরিশেষে, তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানায় বেপজা। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমানে আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও ভূমিকা রাখবে। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।





