১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরণখোলা থেকে ফিরে: ‘ঢাকায় গে সব ভুলে যাবেনি!’

প্রকাশ:

এবারের জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ) বসবে তুরস্কের আনাতোলিয়ায়। নভেম্বরের ৯ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। যদিও সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কোনো থিম এখনো ঘোষণা করা হয়নি, তবে আশা করা হচ্ছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার রোডম্যাপ এবং জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন জোরদারের ওপর সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আসন্ন এই সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে খুলনা বিভাগের তিন উপকূলীয় জেলা—সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের শিশুরা খুলনায় মিলিত হয়েছিল। পরিবর্তিত জলবায়ু তাদের দৈনন্দিন জীবনে কী বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং তা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যেই ছিল এই আয়োজন। আনাতোলিয়ার সম্মেলনে খুলনার শিশুদের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবে। ঘরের মধ্যে জল থাকবে ছয় মাস, উঠানে নয় মাস। স্কুলে যাতি হবে গামছা পরে, বই থাকবে পলিথিনে।

সম্মেলনের একপর্যায়ে আশাশুনি থেকে আসা এক কিশোর তার লেখা ‘এই কি জীবন’ কবিতাটি পড়ে শোনায়, যেখানে উপকূলের লোনা পানি ও বালিকা বধূর যন্ত্রণার কথা ফুটে ওঠে। এই কবিতা এখন উপকূলের যেকোনো সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীতের রূপ নিচ্ছে। সম্মেলনে শরণখোলার কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে কথা হয়, যারা সিডর না দেখলেও মা-বাবা ও বড়দের কাছ থেকে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি শুনেছে। হরেন কাকা কয়, আমার জীবন নিয়ে ভাবি না। সুনীল লিখলে হয়তো এই কবিতা নীল আকাশে উড়ত লবণাক্ত জীবনের নীল ঝান্ডা হয়ে। এ দেশের সাগর ঘোষরা এসব কবিতা ছাপে না। অসহায় সুন্দরবন কেড়ে নিচ্ছে নারীর জরায়ুও।

ভোলা নদীর হারানো গৌরব

চায়ের আড্ডায় সুন্দরবন সীমান্তের ভোলা নদীর প্রসঙ্গটি সামনে আসে। প্রায় ৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি সুন্দরবন ও লোকালয়ের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বলেশ্বর নদে মিশেছে। বইয়ের তথ্যমতে, এর উৎপত্তি মোংলা উপজেলার চাঁদপাই রেঞ্জের খারমা নদী থেকে। অথচ এই প্রজন্মের শিশুরা নদীটিকে চেনে ‘মরা ভোলা’ বা ‘মরা খাল’ নামে। অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ছয়টি গানবোটের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই হয়েছিল এই ভোলা নদীতেই। সরকারি উপজেলা তথ্যভাণ্ডারেও সেই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে। একসময় যে নদী দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচল করত, আজ তার অস্তিত্বই সংকটের মুখে। একাত্তরের গনগনে সেই নদীতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের।

আগুন ও নদীর সম্পর্ক

ধানসাগরের মেয়ে আমিনা সরাসরি সতর্ক করে বলে, ‘ভোলা যত মরবে, ততই আগুন লাগবে।’ ২০২৪ সালের মে মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন বিভাগের তথ্যে ২০০২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে ২৫টি আগুন লাগার রেকর্ড আছে, আর ডেইলি স্টারের তথ্যে বন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ২৩ বছরে ২৯টি আগুনের কথা জানানো হয়েছিল। আমিনার ভাষ্যমতে, ভোলা নদীর মতো খালগুলো মরে যাওয়ায় বনের গভীরে আগুনের ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৪ সালের আমুরবুনিয়া অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের জন্য ভোলা নদীই ছিল পানির প্রধান উৎস, কিন্তু নদী ভরাট ও ভাটার কারণে পানি সংকট প্রকট হয়েছিল। কিন্তু তোরা মেনে নিচ্ছিস ক্যা এই জীবনটা।

লবণাক্ততা ও মিঠাপানির সংকট

তদন্ত-সুপারিশেও ভোলা নদী ও সংযোগকারী খালগুলো পুনঃখনন এবং নদীর পাড়ের বাঁধ কেটে জোয়ারের পানি প্রবেশের পথ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। শিশুরা শুধু অগ্নিকাণ্ড নয়, লবণাক্ততা নিয়েও গভীর চিন্তিত। কানু নামের এক কিশোর জানায়, নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় শুকনার মৌসুমে উজানের মিঠাপানি সুন্দরবনের ভেতরের খালগুলোতে ঢুকতে পারছে না, যা লবণাক্ততা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

  • সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নদী ও খালের ভরাট হওয়া পরিবেশগত বিপর্যয়ের মূল কারণ।
  • গড়াই নদী দিয়ে পদ্মা বা গঙ্গার মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে লবণাক্ততা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
  • ২০২৫ সালের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে সুন্দরবনে চরম লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।
  • রাজশাহী, রূপপুর ও ঢাকার চাহিদা মেটাতে গড়াই-মধুমতী নদীব্যবস্থা আজ প্রায় পানিশূন্য।

শিশুদের এই পর্যবেক্ষণ জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক আলোচনার বাইরেও যে স্থানীয় নদীব্যবস্থা রক্ষার জরুরি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়। সুন্দরবনের পিপাসা মেটাতে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন