বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে ৪০ ব্যাংকের উচ্চ সুদ আদায়

প্রকাশ:

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, আমানতকারীদের মুনাফা নিশ্চিত করতে এবং ঋণের ব্যয় যৌক্তিক রাখতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তবে মে ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অন্তত ৪০টি সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংক এই নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। এসব ব্যাংকে সুদহারের ব্যবধান ৫ শতাংশের ওপরে চলে গেছে, যা আমানতকারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা ও উৎপাদন খাতে ঋণের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে বিদেশী ব্যাংকগুলোতে, যেখানে গড় সুদ ব্যবধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি। দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশী ব্যাংকের গড় সুদ ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৮.১২ শতাংশ। ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের গড়ে মাত্র ১.৯৬ শতাংশ সুদ দিলেও ঋণ বিতরণের সময় আদায় করছে গড়ে ১০.৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে; আমানতে মাত্র ০.৬২ শতাংশ সুদ দিয়ে ঋণে ১০.৩০ শতাংশ আদায় করায় তাদের ব্যবধান ৯.৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) আমানতে ৩.১৮ শতাংশ এবং ঋণে ১১.১৯ শতাংশ সুদ আদায় করছে, যা তাদের ৮.০১ শতাংশ ব্যবধান নিশ্চিত করে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশী ব্যাংকগুলো বহুজাতিক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব থেকে প্রায় শূন্য খরচে তহবিল সংগ্রহ করে এবং তা চড়া সুদে ঋণ দিয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা করে। এই মুনাফার বড় অংশ তারা লভ্যাংশ হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা দেশের সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি এবং ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ২৯টি ব্যাংকও ৪ শতাংশের সীমা মানতে ব্যর্থ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের সুদহার অনেক কম হওয়ায় গ্রাহকদের প্রকৃত আয় নেতিবাচক থাকছে। এর ফলে সঞ্চয়ে অনীহা তৈরি হচ্ছে এবং ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের কস্ট অব ফান্ড স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা এবং সীমা অতিক্রমকারী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে বিদেশী ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাবের তহবিল ব্যবহার করে মুনাফা বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর তদারকি ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

শেয়ার করুন