১০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার বাইরে কাজের খোঁজে: চট্টগ্রাম–কুমিল্লা নাকি নারায়ণগঞ্জ–গাজীপুর

প্রকাশ:

বাংলাদেশে বর্তমানে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) মার্চ ২০২৬-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশে প্রচলিত বেকারত্বের পাশাপাশি আংশিক বেকারত্ব ও অনানুষ্ঠানিক কাজের পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া বেতনভুক্ত চাকরির তুলনায় স্বকর্মসংস্থানের দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ছে, যেখানে তরুণ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতির সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও গবেষণায় দেখা গেছে।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অভাব ও প্রবৃদ্ধির ধীরগতি শ্রমবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল শ্রমশক্তির চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের কিছু বিশেষ এলাকায় শিল্পায়ন ও প্রশাসনিক তৎপরতায় কর্মসংস্থানের ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

দেশের কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে কেন্দ্রীভূত। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫৬ শতাংশ এই করিডরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পায়ন এই ধারার অন্যতম চালিকাশক্তি। মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্বিতীয় অংশ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রথমবার পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ১৮টি শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে, তিনটি প্রস্তুতির পর্যায়ে এবং ১৪টি নির্মাণাধীন।

বেপজা-সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এর আওতাধীন অঞ্চলগুলোতে ২৫ হাজার ১৬৪টি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জন সেখানে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এলইডি, জুতা, তাঁবু ও চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। একইভাবে কুমিল্লা ইপিজেডে প্রায় ৪৯ হাজার ২২৩ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান রয়েছে, যেখানে তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে খেলনা ও ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন হয়।

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকাগুলো ঢাকার অদূরে হওয়ায় এগুলো প্রথাগতভাবে শিল্পসমৃদ্ধ। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত এক দশকে মাঝারি ও বড় অনেক শিল্প ঢাকা শহর থেকে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও আড়াইহাজারের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে ৭৬ হাজার ১৪২ জন কর্মরত আছেন। এসব অঞ্চলে টেক্সটাইল, ইস্পাত, ওষুধ, প্লাস্টিক ও ভোগ্যপণ্য তৈরির কারখানায় দক্ষ জনবলের চাহিদা সবসময়ই থাকে। তবে গ্যাস-সংকট বা কাঁচামালের স্বল্পতার মতো সাময়িক সমস্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও এসব শিল্পাঞ্চলে রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ঢাকার বাইরে বড় পরিসরের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার পদ শূন্য রয়েছে বলে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্যে জানা গেছে। যদিও সব পদ একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রকৌশল দপ্তরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রচুর কর্মী প্রয়োজন। এই শূন্য পদ পূরণে সরকার এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করছে।

আঞ্চলিক শহরগুলোতেও চাকরির বাজারের পরিধি বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যেখানে দেশে প্রায় ৭৮ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১ কোটি ১৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষের সম্পৃক্ততা ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, বগুড়া, যশোর, রংপুর, খুলনা ও সিলেটে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ চাহিদার দিকে লক্ষ্য রাখলে দেখা যায়, হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল ও জুতা তৈরির মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। তাই ক্যারিয়ারের কথা ভাবলে কেবল রাজধানী ঢাকার ওপর নির্ভরশীল না থেকে উদীয়মান এসব শিল্প করিডর ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর দিকে নজর দেওয়া এখন বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। এছাড়া সরকারিভাবে ব্রুনেইয়ে ২৭৯ জন কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও চলমান রয়েছে। পাশাপাশি আড়ংয়ের সেলস অ্যাসোসিয়েট পদে ৫০০ জন নিয়োগের শেষ সময় ২০ অক্টোবর এবং সৌদির কিং আবদুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অর্জনের সুযোগের মতো তথ্যগুলো চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির আরও তথ্য: কর্মসংস্থানে স্বকর্মসংস্থানের অংশ বেড়েছে, কমেছে বেতনভিত্তিক কাজের অংশ। চাকরির আরও তথ্য: এটি শুধু ভবিষ্যতের বিনিয়োগের খবর নয়। চাকরির আরও তথ্য: বেপজার সামগ্রিক হিসাবেও শিল্পাঞ্চলগুলোতে কর্মসংস্থানের বড় একটি ঘনত্ব দেখা যায়। চাকরির আরও তথ্য: কুমিল্লার শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের ভিত্তিও পুরোনো। চাকরির আরও তথ্য: ২৬৭ একর এলাকার এই ইপিজেডে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি জুতা, চামড়াজাত পণ্য, খেলনা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক পণ্য ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি হয়। চাকরির আরও তথ্য: বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ ঢাকা শহর থেকে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ শহর এবং আরও বাইরে নরসিংদী ও আড়াইহাজারের দিকে সরে গেছে।

শেয়ার করুন