উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংকটের কারণে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়েছে। এই জ্বালানি সংকট দৈনন্দিন রান্নাবান্না থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, এমনকি হাসপাতালের কার্যক্রমকেও ব্যাহত করছে। ঢাকায় বসবাসকারী পারভিন আক্তারের মতো সাধারণ মানুষ এখন পাইপলাইনে গ্যাস আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন; অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক সময় রাত ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ইন্ডাকশন চুলায় রান্নার চেষ্টা করলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে খাবার আধসেদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হয়। বর্তমানে লোহিত সাগরে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের সংঘাত বাণিজ্য চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই দুই নৌপথে সংকটের ফলে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন বৃটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল প্রায় ১০ ডলার। শেল-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন কমেছে।
বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি এলএনজি থেকে আসে। আগে এই এলএনজির ৯৫ শতাংশ কাতার থেকে আসলেও এখন সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর জরিপ অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছেন এবং ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একটি কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় বয়লার নষ্ট হয়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিস করা হয়েছে।
পোশাকশিল্পের নির্বাহী ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের এক ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য পাঠাতে বিমান পরিবহনে তাদের অতিরিক্ত ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। এছাড়া ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান জানান, কারখানা চালু রাখতে ডিজেলের পেছনেও বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এদিকে, টাঙ্গাইলের পোলট্রি খামারি সায়েদুল ইসলামের খামারে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে।
হাসপাতালগুলোও এই সংকটের বাইরে নয়। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আইসিইউ জেনারেটরে চললেও ওয়ার্ডগুলোতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাবে রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে সরকার সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) ফজলুল হক জানিয়েছেন, একটি অচল এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা সচল হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। ব্যবসায়ী এহসানসহ অনেকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেও গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট চলছে।





