সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য নেওয়া বাড়তি ১১৬ কোটি টাকার উৎসাহ বোনাস ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ১১ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেয়। ব্যাংকটির প্রায় ২১ হাজার ৫০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত তিনটি বোনাসের পাশাপাশি দুটি বাড়তি বোনাস গ্রহণ করেছিলেন, যা নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদিত ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী তৎকালীন এমডি আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করে পাঁচটি বোনাসের দাবি জানান। এর আগে চাপের মুখে তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ এই বোনাস অনুমোদন করেছিল, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এতে সম্মতি দেয়নি এবং এ নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তিও ছিল। পরবর্তীতে ২০ আগস্ট জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী পদত্যাগ করেন। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ২৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীও বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন, তবে সফল হননি। মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যাংকের একজন পরিচালক জানান, একশ্রেণির কর্মীর 'মব' বা চাপের মুখে বোনাস আদায়ের ফলে পুরো ব্যাংক এখন জটিলতায় পড়েছে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এর সমাধান কঠিন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানায়, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের কোনো নীতিমালাই পাঁচটি বোনাস নেওয়ার সুযোগ দেয় না। বোনাস দেওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে অনুমোদনের আবেদন ও ক্ষমা প্রার্থনা করলেও বিভাগটি তা অনুমোদন করেনি। ব্যাংকটির বর্তমান এমডি ও সিইও শওকত আলী খান জানান, তিনি যোগ দেওয়ার আগেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যেহেতু টাকা ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে, তাই তারা সরকারকে এটি মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং নতুন করে পুনরায় একই অনুরোধ জানাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ ভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক পাঁচ বোনাস বাবদ ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে এবং ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১১ মার্চ ২০২৫ তারিখে পাঠানো চিঠিতে জানায়, ব্যাংকটির নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। ৮ আগস্ট ২০২৪ সালের পর্ষদ সভায় এই বোনাসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল শর্তসাপেক্ষে, যেখানে বলা হয়েছিল ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি টাকা ফেরত দিতে সবাই বাধ্য থাকবেন এবং ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা দেবেন।
এদিকে, সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঢালাও বোনাস দেওয়ার প্রবণতা রোধে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। এখন থেকে সোনালীসহ ছয়টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বোনাস নির্ভর করবে পাঁচটি নির্দিষ্ট সূচকের ওপর, যার মধ্যে নিট মুনাফার হারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বোনাস এখন আর কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন নয়, বরং ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তারপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ বৈঠকে পাঁচ বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।চিঠি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ অনুমোদন করা হয় শর্তসাপেক্ষে।





