৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা

প্রকাশ:

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে নীতিনির্ধারকরা নিয়মিত বৈঠক ও পর্যালোচনা করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার মতো কারণগুলো দায়ী। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খনন এবং তিনটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ কোটি ঘনফুট থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি কয়লার উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে জানান, সরকার জনগণের দুর্ভোগ সম্পর্কে অবগত এবং এই সংকট দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ভুলনীতির ফল। তিনি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার সময়সীমা নভেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণে আরও দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৩২ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ স্থাপনের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে সরবরাহ মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে লোডশেডিং কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারকে ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রির ফলে সরকারের আর্থিক লোকসানও বাড়ছে। এলএনজি খাতে ভর্তুকি ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং জ্বালানি তেলে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সরবরাহ এবং সারাদেশে এলপিজি ডিপো স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সরকার দ্রুত সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৮৭ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।

শেয়ার করুন