কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার পরও এর ঝুঁকিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আয়ারল্যান্ড সফরের সময় তিনি দাবি করেন, এআই নিয়ে যেসব নেতিবাচক সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে, তার অনেক কিছুই বাস্তবে ঘটবে না। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, অনেক নেতিবাচক শক্তি এআই নিয়ে এমন সব বিষয় সামনে আনছে যা আসলে ঘটার সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে তিনি এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে চীনের চেয়ে এগিয়ে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষ্যমতে, যে এআইয়ের লড়াইয়ে জিতবে, বিশ্বজুড়ে সেই এগিয়ে থাকবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের বিপরীতে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন বিবিসিকে জানিয়েছেন, বর্তমান গতিতে এআইয়ের উন্নয়ন চলতে থাকলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এবং এই প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মী আতঙ্কিত। তিনি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর ধারণাকে সমর্থন করলেও চীনের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া একতরফাভাবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন বলে মনে করেন।
এর আগে শনিবার অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে এই পদক্ষেপ জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন, তবে চীন যাতে কোনোভাবেই এগিয়ে যেতে না পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তার এই আহ্বানে সমর্থন জানিয়েছেন এক্সএআইয়ের মালিক ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান।
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও রয়েছে। ওপেনএআই গত আগস্টে জানায়, নিরাপত্তা বাড়াতে তারা তাদের কয়েকটি উন্নত এআই মডেলের প্রশিক্ষণের গতি কমিয়ে দিয়েছে। হাগিং ফেস নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এআই এজেন্টদের সাইবার হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে। এছাড়া, বিশ্বের দুটি শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা সাইবার হামলার সময় মানুষকে প্রতারণা করতে ভুয়াল মানবপ্রোফাইল তৈরি করেছিল। যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অ্যানথ্রপিকের ‘মিথোস এআই’ ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে একটি সেবায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিল এবং পরে প্রমাণ লুকানোরও চেষ্টা চালায়।
ওয়াশিংটনে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে সতর্ক করে বলেছেন, কংগ্রেস যদি তাড়াহুড়ো করে এআই নিয়ন্ত্রণের আইন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। তবে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস এআইয়ের উন্নয়ন কমিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ডেভিড স্যাকস মনে করেন, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের উদ্যোগেই উন্নয়নের গতি নির্ধারণ করা উচিত।
তবে দুই দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে ঐকমত্যও দেখা যাচ্ছে। জুলাই মাসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা মিলে ‘ফ্রন্টিয়ার অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেছে, যেখানে এআইয়ের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ও তদারকি কাঠামো গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। বিলটির সহ-উদ্যোক্তা লরি ট্রাহান বলেন, নিরাপত্তা গবেষকদের পদত্যাগ এবং শক্তিশালী এআই মডেলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বেরিয়ে আসার ঘটনায় কংগ্রেসের নীরব থাকার সুযোগ নেই। তবে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা জরুরি, যদিও এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা সচেতন।





