৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের জয়জয়কার

প্রকাশ:

অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশিদের কাছে একসময় রাজনীতি ছিল অনেকটা দূরের বিষয়। নতুন দেশে টিকে থাকা, পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা আর নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়াই ছিল প্রধান চিন্তা। তবে সেই বাস্তবতা এখন বদলেছে। এখন অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা শুধু প্রার্থীই হচ্ছেন না, জয়ী হয়ে বসছেন কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে। নিউ সাউথ ওয়েলসের একাধিক কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধিদের এই উপস্থিতি দেখাচ্ছে—অভিবাসী হিসেবে শুরু করা সেই যাত্রা এখন পৌঁছে যাচ্ছে নেতৃত্বের পর্যায়েও।

ক্যাম্পবেলটাউন, ক্যামডেন, কাম্বারল্যান্ড, ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন ও ডাব্বোর স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধিদের পথচলা ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতার দৃষ্টান্ত। কেউ একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন, কেউ প্রথমবার ভোটে নেমেই জয় পেয়েছেন, আবার কেউ পেয়েছেন ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব।

ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাসুদ চৌধুরী ২০১৬ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০২১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯১ সালে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়া মাসুদ চৌধুরী বলেন, ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করা তার জন্য গর্বের এবং এটি ক্যাম্পবেলটাউনের সব মানুষের জন্য কাজ করার একটি দায়বদ্ধতা। একই কাউন্সিলে ২০২১ সালে 'কমিউনিটি ভয়েস'-এর ব্যানারে নির্বাচিত মাসুদ খলিল ২০২৩-২৪ মেয়াদে ডেপুটি মেয়র ছিলেন এবং ২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০২৭ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য নির্বাচনে ম্যাককুয়ারি ফিল্ডস আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া ক্যাম্পবেলটাউনের নতুন মুখ অ্যাশ রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

নারীদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় এলিজা রহমান নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্যামডেন সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পান। তিনি নিউ সাউথ ওয়েলসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম নারী হিসেবে এই পদে আসীন হলেন। এছাড়া লেবার পার্টির ক্যামডেন ব্রাঞ্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকসটাউন সিটি কাউন্সিলে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে শিরিন আক্তার প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের ওয়েন্টওর্থভিল ওয়ার্ড থেকে ২০১৭ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া সুমন সাহা ২০২১ ও ২০২৪ সালেও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসা সুমন সাহা স্থানীয় রাস্তার নিরাপত্তা ও খেলার মাঠের উন্নয়নের মতো তৃণমূল পর্যায়ের সেবাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ডাব্বো আঞ্চলিক কাউন্সিলে ২০২১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৪ সালেও শিবলী চৌধুরী পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির ওপর জোর দিচ্ছেন।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে এই উত্থান প্রমাণ করে যে, মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হতে শুধু নিজ কমিউনিটির সমর্থন যথেষ্ট নয়, বরং বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে হয়। এই জনপ্রতিনিধিদের পথচলা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা—ভোটার হওয়ার পাশাপাশি নীতি নির্ধারণের জায়গাতেও নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন