গ্যাসের সংকটে দিশেহারা মানুষ, বিকল্প বিদ্যুতেও মিলছে না স্বস্তি

প্রকাশ:

গ্যাসের দেখা নেই, তাই ভরসা করা হয়েছিল বিদ্যুতের ওপর। কিন্তু এখন বিদ্যুৎও হাওয়া! রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম—সবখানেই এখন হাহাকার। গ্যাসের তীব্র সংকটে বিকল্প হিসেবে যারা বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন বা রাইস কুকারের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তারাও পড়েছেন চরম বিপাকে। ভোগান্তিতে পড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ করে শিরিন নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, গ্যাসের দুঃখে বাধ্য হয়ে বিদ্যুতে গেলাম, এখন বিদ্যুৎও নেই। যাবো কোথায়?

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম। অনেক জায়গায় সারাদিনও মিলছে না গ্যাস। এর ওপর দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। বাসা-বাড়িতে সকালের নাশতা বানানো কিংবা দুপুরের রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন গৃহিণীরা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সমন্বয়হীনতায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে। তাদের মতে, কোনো একটি সেবার ঘাটতি তৈরি হলে বিকল্প সেবার সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুটি সেবারই এমন বেহাল দশা জনজীবনকে পুরোপুরি স্থবির করে তুলেছে। দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দুর্ভোগ আরো চরমে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রতি বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকে বা একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায় না, সেসব এলাকার ক্রেতাদের উপস্থিতিই বেশি। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে দিনে যেখানে ৪ থেকে ৫টি বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হতো, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা ১ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকার ইলেকট্রিক ও ইনডাকশন চুলার। তবে উন্নত মানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের চুলাও বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে তুলনামূলক ভালো মানের পণ্যই বেছে নিচ্ছেন।

মিরপুর এলাকার গৃহকর্মী ফাতেমা জানান, দিনের বেশিরভাগ সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে চুলা জ্বালানো কঠিন। ফলে ওই বাসার কর্তা বাধ্য হয়ে ৭ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে একটি ইনফ্রারেড কুকার ও রাইস কুকার কিনেছেন। শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ বিশ্বাস জানান, লাইনে গ্যাস না থাকায় তিন দিন ধরে তার বাসায় রান্না বন্ধ। মোহাম্মদপুরের ইরফান ও লায়লা দম্পতি এলপিজি সিলিন্ডার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকালে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে বাধ্য হয়েছেন। লায়লা জানান, দুই দিন ধরে বাসায় রান্নাবান্না নেই, বাইরে থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন। অনেকে আবার গ্যাসের খরচ কমাতে বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন, কিন্তু রাইস কুকারে ভাত রান্না করতে গেলেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে পড়ছেন।

গত ২২ জুলাই দেশের ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের পর এই সংকট শুরু হয়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি সরবরাহ কমে যায়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মোঃ শোয়েব বলেছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ পূর্বের অবস্থায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ২১ জুলাই সংকটের আগে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হলেও এখন ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ২১ জুলাই দেশীয় উৎসের গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে।

বাজারে ইনফ্রারেড ও ইন্ডাকশন—এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি, কারণ এতে যেকোনো ধরনের পাত্রে রান্না করা যায়। অন্যদিকে ইন্ডাকশন চুলায় নির্দিষ্ট ফেরোম্যাগনেটিক পাত্র প্রয়োজন হয়। ইনফ্রারেড ও ইন্ডাকশন চুলার দাম সাধারণত সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে। তবে নন-ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলার দামও কাছাকাছি বা এর চেয়ে ৩০০-৪০০ টাকা কম। চাহিদা বেশি থাকায় কোনো কোনো বিক্রেতা সুযোগ বুঝে ২০০-৪০০ টাকা বাড়তি দাম চাইছেন। আরএফএলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মুর্শিদ মুনিম জানান, গত বছরের তুলনায় ইনফ্রারেড কুকারের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং রাইস কুকারের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ। আরএফএল তাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িয়েছে। ওয়ালটনের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনায়েদ জানান, তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের চাহিদা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ওয়ালটনের ১২ থেকে ১৫ ধরনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকারের দাম ৩ হাজার ৭৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে। তবে কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান হায়দার জানান, তাদের ব্যবসায় এই সংকটের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।

শেয়ার করুন