নাইন ইলেভেন: যে ঘটনার পর বদলে গিয়েছিল মুসলিম ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক

প্রকাশ:

গত ২৫ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ ঘটনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ‘নাইন ইলেভেন’। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিমান আঘাত হানে। একই দিনে আরও দুটি বিমান ছিনতাই করা হয়, যার একটি পেন্টাগনে আঘাত করে এবং অন্যটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। এই হামলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইসলামপন্থি সশস্ত্র সংগঠন আল-কায়েদা এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে। ঘটনার পর ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতির উদ্দেশে ভাষণে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বা ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো তাদের সঙ্গে।’

হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ায় তালেবান সরকার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, একই বছর ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। নাইন ইলেভেনের পর এই যুদ্ধ আফগানিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপে রূপ নেয়।

আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হয়। পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, মিশর ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিনবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও মার্কিন প্রশাসন বারবার দাবি করেছে যে তাদের লড়াই কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে; কিন্তু মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যায় আস্থা রাখতে পারেনি।

নাইন ইলেভেনের অভিঘাত কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এর গভীর সামাজিক প্রভাব পড়েছে। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণাজনিত অপরাধের সংখ্যা ছিল ২৮টি, যা ২০০১ সালে বেড়ে ৪৮১টিতে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি ঘটনা ঘটে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী সময়ে। এমনকি ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষী অপরাধের সংখ্যা প্রায় কোনো বছরেই ১০০-এর নিচে নামেনি।

দুই দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও সেই দিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষত এখনো অমলিন। নাইন ইলেভেন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিই বদলে দেয়নি, বরং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

শেয়ার করুন