দেশজুড়ে সার নিয়ে কৃষকের ভোগান্তি, ডিলারদের বিরুদ্ধে বাড়তি দামের অভিযোগ

প্রকাশ:

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে, আবার কোথাও ডিলারের দোকানে সার থাকলেও ‘নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি বিভাগ ও ডিলারদের বেশির ভাগই বলছেন সার সংকট নেই, তবে কৃষকদের অভিযোগ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম এবং কোনো কোনো এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে।

যশোরের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, খোলা বাজারে ইউরিয়া ও টিএসপি সার কেজিপ্রতি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সদর উপজেলার রাহেলাপুরের কৃষক শরিফউদ্দিন জানান, খুচরা বাজারে ইউরিয়া কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে। হাশিমপুরের মামুনুর রশিদ, পল্পব হোসেন ও পাঁচবাড়িয়ার রেজাউল করিম জানান, টাকা বেশি দিলে সার আছে, কম দিলে নেই। বস্তাপ্রতি ইউরিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে হাশিমপুর বাজারের সাব-ডিলার আব্দুল মতিন অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন। তার দাবি, ডিলারের কাছ থেকে সার পরিবহণে ভ্যান-নসিমনে বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৩৪৯ টাকা খরচ হয় এবং কৃষকের কাছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হাসান বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। জেলায় বরাদ্দ রয়েছে ইউরিয়া ৭ হাজার ৮২২ টন, টিএসপি ১ হাজার ৩৮২ টন, ডিএপি ৩ হাজার ৮১৯ টন ও এমওপি ২ হাজার ১৬৬ টন।

রাজশাহীতে সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৫ হাজার ১৮৬ টন, টিএসপি ১ হাজার ৪৫ টন, এমওপি ১ হাজার ৬২৯ টন ও ডিএপি ৩ হাজার ১৫ টন বরাদ্দ হয়েছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা কামাল হোসেন। পবার দর্শনপাড়ার সার ডিলার মেসার্স স্কাই এন্টারপ্রাইজের মালিক ফজলুল করিম জানান, তার বরাদ্দের মধ্যে ২০ টন ইউরিয়া, ৭ টন পটাশ ও ২৫ টন ডিএপি মজুত আছে। পবার দামকুড়ার ডিলার রবিউল ইসলামও সার সংকট নেই বলে দাবি করেন। তবে কৃষক আব্দুল আলিমের অভিযোগ, দোকানে সার থাকলেও ‘নেই’ বলে কৃষকদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। গোদাগাড়ীর নিমতলার কৃষক আবুল কালাম জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও চাহিদামতো সার মিলছে না এবং রশিদ না দিয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।

মাগুরায় আগস্টের বরাদ্দের পরও বিভিন্ন ধরনের সার মজুত ছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর পৌরসভা ও সদর উপজেলার অধিকাংশ ডিলারের দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। মঘির মহিষাডাঙ্গার কৃষক নাজমুল হাসান জানান, ২ সেপ্টেম্বর ডিলার নতুন সার তুললেও মঙ্গলবার ফসফেট ও ডিএপি চাইলে ‘সার নেই’ বলে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তিতারখাঁপাড়ার আব্দুল হাকিম ২০ কেজি ডিএপি চাইলে পেয়েছেন ১০ কেজি। ডিলার নিমাই পাল জানান, এ মাসে তিনি ১৮৫ বস্তা টিএসপি, ১৫০ বস্তা ডিএপি, ১৩৯ বস্তা এমওপি ও ২ হাজার বস্তা ইউরিয়া পেয়েছেন। রাঘবদাইড়ের ডিলার সোহরাব হোসেন জানান, চাহিদা বেশি হওয়ায় দ্রুত উপবরাদ্দ না দিলে সংকট তৈরি হতে পারে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার নতুনহাটে বেশি দামে সার বিক্রির সময় বিসিআইসি ডিলার নিতাই চন্দ্র সাহা ও কীটনাশক ব্যবসায়ী আসাদুল আলমকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাজারহাটে নাজিমখান ইউনিয়নের এক ডিলারের সেপ্টেম্বরের ৪৪ টন ইউরিয়া ১০ দিনেই শেষ হয়েছে। উমর মজিদ ইউনিয়নের আরেক ডিলারকে বরাদ্দের অতিরিক্ত ১০ টন উপবরাদ্দ দেওয়ার পরও চাহিদা শেষ হয়নি। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, উপজেলায় সার সংকট নেই।

নাটোরের সিংড়ায় টিএসপি সার নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার পৌর শহরের আট ডিলারের গুদাম ঘুরে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি পর্যাপ্ত পাওয়া গেলেও অধিকাংশ গুদামে টিএসপি ছিল না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ উদ্দিন বলেন, টিএসপির চাহিদা বেশি। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে বৃহস্পতিবার মেসার্স মণ্ডল ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ১৩ বস্তা বিভিন্ন সার পাচারের সময় চালক ও ক্রেতাকে আটক করা হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, তদন্তে দোকানের সারের হিসাবে গরমিল পাওয়া যায়নি।

দিনাজপুরে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের অভিযানের পর ডিলাররা সার সংকট নেই বলে দাবি করছেন। সদর উপজেলার পুলহাটের রূনা ট্রেডার্সে ইউরিয়া ৪৪.৮৫ টন, টিএসপি ২২.১৫ টন ও ডিএপি ৩৮.৩০ টন মজুত পাওয়া যায়। তবে কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, চাহিদামতো সার না পেয়ে গত মাসে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনে রেখেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় চার ধরনের সারের চাহিদা ২ লাখ ৫৮ হাজার ১১৫ টন এবং সেই পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

লালমনিরহাট ও কালীগঞ্জে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে ‘সার নেই’ বলে ফেরানো হচ্ছে। বিএফএর জেলা সভাপতি আব্দুল হাকিম অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকারি নিয়মে নিয়মিত সার উত্তোলন ও বিতরণ হচ্ছে। কালীগঞ্জের ডিলার বাদশা মিয়া জানান, তার বরাদ্দের ইউরিয়া ১ হাজার ২০০ বস্তা, টিএসপি ৭৫, এমওপি ৮৮ ও ডিএপি ৭৪ বস্তা সময়মতো উত্তোলন ও বিতরণ করা হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে মজুত রয়েছে ইউরিয়া ৯৯৩, টিএসপি ৩০২, ডিএপি ৭৭৮ ও এমওপি ৯৭৬ টন।

ময়মনসিংহের নান্দাইলে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও কৃষকরা বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈমা সুলতানা বলেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে। ফুলপুরে ইউরিয়া ৩৯০ টন উত্তোলন ও ৩৪১ টন মজুত রয়েছে। গৌরীপুরে মজুত রয়েছে ইউরিয়া ২৮১.৯০, টিএসপি ৩৭.৫, ডিএপি ৪৭.৮ ও এমওপি ৬১.৩০ টন। জামালপুরের মাদারগঞ্জে মেসার্স শামসুল হকের দোকানে ১০ টন সার আনা হলেও তা গুদামে তোলা হয়নি। ডিলারের জামাতা রবিউল ইসলাম জানান, সেপ্টেম্বরে ৮০ টন বরাদ্দের মধ্যে প্রথমে ৪০ ও পরে ১০ টন তোলা হয়েছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে ৮ বিসিআইসি ও ১২ বিএডিসি ডিলারের কাছে মোট ১৬ হাজার ২৮৪ বস্তা সার মজুত রয়েছে। জয়পুরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাফশিয়া জাহান জানান, ১২ ডিলারকে সেপ্টেম্বরে ৬৩৪ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নওগাঁর নাচোল উপজেলায় সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৮১৫ টনের বিপরীতে ২৯০ টন, ডিএপি ৮১৪ টনের বিপরীতে ৩১২ টন, টিএসপি ১৬০ টনের বিপরীতে ৩২ দশমিক ২০ টন এবং এমওপি ৪০৫ টনের বিপরীতে ১৬১ টন মজুত রয়েছে। রাণীনগর উপজেলায় কৃষি বিভাগের স্লিপ বা টোকেন ছাড়া সার মিলছে না বলে কৃষকদের অভিযোগ, তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন বলেন, প্রকৃত কৃষকের হাতে সার পৌঁছাতেই স্লিপ দেওয়া হচ্ছে এবং উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই।

ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : ভূরুঙ্গামারী উপজেলার নতুনহাটে বেশি দামে সার বিক্রির সময় বিসিআইসি ডিলার নিতাই চন্দ্র সাহা ও কীটনাশক ব্যবসায়ী আসাদুল আলমকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দুই কৃষকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হয়েছিল। টাকা ফেরত দিয়ে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪০ টাকায় সার বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে ইউরিয়া ২ হাজার ১৪৫, টিএসপি ৫৪১.৯৫, ডিএপি ১ হাজার ১২৯.৬০ ও এমওপি ৮২৭.৪৫ টন উত্তোলন হয়েছে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ইউরিয়া ৯৯৩, টিএসপি ৩০২, ডিএপি ৭৭৮ ও এমওপি ৯৭৬ টন। জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাইখুল আরিফিন বলেন, আমন মৌসুমে সারের কোনো ঘাটতি নেই।

শেয়ার করুন