উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ১৩ দফা ঘোষণা

প্রকাশ:

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, প্রকল্প প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিবিড় তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।

কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ওই সংসদ সদস্য জানতে চেয়েছিলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা রুখতে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং তা বাস্তবায়নে তদারকি পরিকল্পনা রয়েছে কি না।

জবা‌বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। বরং প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, কেনাকাটা ও ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন স্তরের একাধিক দুর্বলতা একসঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সংকট তৈরি করে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সমস্যাগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ত্রুটিপূর্ণ ব্যয় প্রাক্কলন, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রিতা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।

এই অপচয় ও দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধে সরকারের নেওয়া ১৩ দফা পদক্ষেপের কথা সংসদে বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এই পদক্ষেপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. যেকোনো নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে একটি নির্ভুল ও নিখুঁত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা হবে।২. প্রকল্প অনুমোদনের পর পরই তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।৩. প্রকল্প তৈরি, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্দেশিকাগুলোকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কাজ চলমান রয়েছে।৪. চলমান প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে।৫. মাঠপর্যায়ে নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা এবং তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।৬. ভূমি অধিগ্রহণ এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো হবে।৭. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে না পারলে, বিলম্ব ও ব্যয় বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।৮. যেসব প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর কার্যকারিতা ও উপযোগিতা যাচাই করে পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন অথবা তা চালু রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।৯. বিচ্ছিন্নভাবে কোনো প্রকল্প না নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।১০. সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।১১. প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করা হচ্ছে।১২. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি (PPP) মডেলের প্রকল্প গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।১৩. সরকারি কেনাকাটায় প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫’ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন