সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর নতুন বিধিমালা ও বিতর্ক

প্রকাশ:

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষারই নম্বরের মান বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নতুন কাঠামো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও ইহাদের আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাসমূহের ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মান বণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’ তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই খসড়া বিধিমালা এখন চূড়ান্ত হওয়ার পথে।

প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ১১-১২তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় মোট নম্বর হবে ১৫০, যার মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ১০০ ও মৌখিক পরীক্ষায় ৫০ নম্বর থাকবে। ১৩-১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে মোট নম্বর ১০০ নির্ধারণ করা হয়েছে; এখানে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ ও মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ নম্বর থাকবে। এছাড়া ১৭-২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষাতেই ২৫ করে নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় পাসের হার ১১-১২তম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ এবং বাকি গ্রেডগুলোতে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মৌখিক পরীক্ষায় সব ক্ষেত্রেই ৪০ শতাংশ নম্বর পাওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোনো প্রার্থীর জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষা নির্ধারিত থাকলে, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাকে সেই পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে হবে।

বর্তমানে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংযুক্ত অধিদপ্তর ও দপ্তরের ‘কমন পদ’ নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী উচ্চমান সহকারীসহ সমপর্যায়ের পদে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ নম্বর থাকে। তবে সচিবালয় নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা অফিস সহকারীর মতো পদে লিখিত পরীক্ষা ১০০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর মাত্র ১০। নতুন প্রস্তাবে গ্রেডভেদে এই কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসছে। তবে এই বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, ব্যাটালিয়ন আনসার, কোস্ট গার্ড, র‍্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) আওতাধীন কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

সরকারের দাবি, নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় ঠেকানো এবং প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সচিবালয়ে জানিয়েছেন, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকার এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।

এই পরিবর্তনের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যারা গত ৪ আগস্ট প্রতিবেদন দেয়। এরপর ৩০ আগস্ট নিয়োগবিধি পরীক্ষণসংক্রান্ত উপকমিটির সভায় খসড়া প্রজ্ঞাপন ও তফসিল প্রস্তুত করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন এই সারসংক্ষেপ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে।

এদিকে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীদের মধ্যে নম্বরের ব্যবধান কম থাকলে মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়াবে। সাবেক সচিব এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। তিনি ৭ সেপ্টেম্বর ‘হয়তো অরণ্যরোদন!’ শিরোনামে লেখেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০-এর বেশি করা যৌক্তিক নয়। এতে সরকার দুর্নামে পড়বে, দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটবে এবং সুশাসন বাধাগ্রস্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ার করুন