জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকার নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য সুবিধাভোগীর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই বেতন স্কেল কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং এর সাথে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়, বেসরকারি খাতের মজুরিকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
নতুন এই কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে, প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, বর্তমান মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই বেতনকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর একটি ইতিবাচক দিক হলো নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ। ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ এবং ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার প্রধানত ১০০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া পুরনো কাঠামোর ১:১.৯৪৫ অনুপাত নতুন স্কেলে ১:১.৭৮-এ নেমে এসেছে, যা বেতনবৈষম্য কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দেয়। তবে মূল বেতনের এই অনুপাত কমালেই প্রকৃত আয়বৈষম্য কমবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ বিভিন্ন ভাতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সুযোগ-সুবিধা এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। আগামী দুই অর্থবছরে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। এই বিশাল আর্থিক বোঝা সামলাতে গিয়ে সরকার যদি করের চাপ বাড়ায়, ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি করে অথবা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয় সংকুচিত করে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যদি উৎপাদন ও সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তবে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে। অতীতেও বেতন বৃদ্ধির পর বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তাই শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ালেই জীবনযাত্রার মান বাড়বে না, বরং এর সাথে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, করের আওতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে বেতন স্কেলকে একটি সমন্বিত জাতীয় মজুরি নীতির অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যাতে সরকারি ও বেসরকারি সব স্তরের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমান সুরক্ষিত থাকে।





