খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ

প্রকাশ:

বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এই উচ্চ হারের কারণে খেলাপি ঋণের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পরেই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানার মতো দেশগুলো। অতীতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন এই তালিকায় শীর্ষে থাকলেও, দেশটি ঋণ আদায়, পুনর্গঠন এবং নতুন ভালো মানের ঋণ বিতরণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে তালিকার বাইরে চলে এসেছে। রাশিয়ার হামলার পরে অর্থনৈতিক ধাক্কায় তা প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। তবে ২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেনের ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে এতদিন আড়ালে থাকা বেনামি ও অনিয়মিত ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় প্রকৃত চিত্রটি এখন প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৩৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন হৃভনিয়া বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। গত মার্চ মাস শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই খেলাপি ঋণ হঠাৎ তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন বিশেষ ছাড়, পুনঃ তফসিল এবং হিসাবগত কৌশলের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই এবং দেশি-বিদেশি নিরীক্ষায় জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক, যেখানে বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, জ্বালানিসংকট ও ব্যবসায়িক মন্দা এই পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ (২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত), ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে ৩০ শতাংশ, আলজেরিয়ায় ২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ (২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) এবং ঘানায় ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ (২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক)। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালে তাদের খেলাপি হার ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তারা পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করে এবং কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এই উন্নতি ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক মানের শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি নীতি অনুসরণ করছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল পুনঃ তফসিল বা অবলোপনের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ, অর্থ আদায়, মামলা নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। নতুবা কেবল সাময়িক ছাড় দিলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের সংকট কাটবে না।

শেয়ার করুন