আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে মোমিনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মোমিন তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর অটল বিশ্বাস রাখে, কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। এরাই প্রকৃত সত্যনিষ্ঠ। এছাড়া সুরা মুমিনুনের প্রথম ১১টি আয়াতে মুমিনের সাতটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হওয়ার সুসংবাদ পায়।
মুমিনের প্রথম গুণ হলো নামাজে বিনয় বা খুশু অবলম্বন করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, নামাজে তাঁর চোখের শীতলতা নিহিত রয়েছে (নাসায়ি: ৩৯৪০)। দ্বিতীয়ত, মুমিন অনর্থক কথাবার্তা ও কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, যা একজন সুন্দর মুসলিম হওয়ার অন্যতম নিদর্শন (তিরমিজি: ২৩১৮)। তৃতীয়ত, জাকাত আদায় করা মুমিনের অন্যতম ফরজ দায়িত্ব। জাকাত আদায় না করার পরিণাম সম্পর্কে সুরা তাওবার ৩৪-৩৫ আয়াতে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাময় শাস্তির সুসংবাদ দাও। কিয়ামতের দিন এই সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের কপাল, পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে।
চতুর্থ গুণ হিসেবে মুমিন তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। সে নিজের স্ত্রী ও শরিয়তসম্মত মালিকানাধীন দাসী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে চাহিদা পূরণ করে না। সুরা নুর-এর ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে নারী ও পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি অবনত রাখা ও লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো আমানত রক্ষা করা। আল্লাহ সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আমানত তার হকদারকে বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। ষষ্ঠত, মুমিন সর্বদা অঙ্গীকার পূরণ করে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হোক বা একতরফা ওয়াদা—ইসলামি আইনে তা পূরণ করা আবশ্যক এবং এর খেলাফ করা প্রতারণা ও হারাম। সুরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে।
সপ্তম ও শেষ বৈশিষ্ট্যটি হলো নামাজের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ। এর অর্থ হলো সব শর্ত, আদব ও নিয়মাবলি মেনে সময়মতো জামাতের সঙ্গে নিয়মিত নামাজ আদায় করা। তাফসিরে কাবির (২৩/২৬৩) অনুযায়ী, নামাজের এই রক্ষণাবেক্ষণ মুমিনকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মিরাস লাভে সাহায্য করে এবং তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে।
মোমিনের পরিচয় বর্ণনা করে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, 'মোমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। অতঃপর তাতে কোনো ধরনের সন্দেহ পোষণ করেনি। আর তাদের জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো সত্যনিষ্ঠ।' (সুরা হুজরাত : ১৫)। আরও এরশাদ হয়েছে, 'নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মোমিনরা, যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। যারা জাকাত সম্পাদনকারী। যারা নিজ লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে; নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসীদের (দাস প্রথা বর্তমানে রহিত) ছাড়া অন্য সবার থেকে। কেননা এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এ ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারাই হবে সীমা লঙ্ঘনকারী এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। যারা নিজেদের নামাজের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এরাই হলো সেই ওয়ারিশ, যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মিরাস লাভ করবে। তারা তাতে সর্বদা থাকবে।' (সুরা মুমিনুন : ১-১১)।
চার. মোমিন তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। নিজের চাহিদা পূরণের জন্য সে কোনো অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে না। নিজের স্ত্রী ও শরিয়তসম্মত দাসী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে তার চাহিদা পূরণ করে না। আল্লাহ বলেন, 'মোমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত এবং মোমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।' (সুরা নুর : ৩০-৩১)।





