নেপালের বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে হাসপাতালের দেয়ালে ছবির সারি

প্রকাশ:

হিমবাহধসের কারণে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী ঢলে পুরো গ্রাম ভাসিয়ে নেওয়ার পর নিখোঁজ হাজারো মানুষের স্বজনরা এখন দিশেহারা। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেয়ালে সারি সারি নিখোঁজ মানুষের ছবি সাঁটানো হয়েছে। কোথাও স্কুলের ইউনিফর্ম পরা এক কিশোরী, কোথাও গোলগাল গালের শিশু, আবার কোথাও বিয়ের দিনের হাসিমুখের দম্পতি কিংবা পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ। দেয়ালে লাগানো প্রতিটি ছবির নিচে একটাই আর্তি—এ মানুষটিকে কেউ দেখেছেন কি? ছবির মানুষগুলোর কেউ জানে না তারা কোথায়, বেঁচে আছে কি না। হাসপাতালের দেয়ালে সাঁটানো ছবিগুলোর নিচের আঠাও এখনো শুকায়নি।

নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা শনিবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। নেপালে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চিতওয়ান শহরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো, যার ফলে মৃতদেহ রাখার জন্য অস্থায়ী ভবন তৈরি করতে হয়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া কিছু মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম বহু এলাকায় এখনো শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। কাদামাটির নিচে আরও কত মানুষ চাপা পড়ে আছে, তা উদ্ধারকারীরাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও এখন বিশাল এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্যোগ আঘাত হানার চার দিন পরও রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে স্বজনদের ভিড় কমেনি। পুলিশ ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের নাম নিবন্ধন করছেন। দুর্গত অনেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকায় নিখোঁজদের তথ্যের সন্ধানে হাসপাতালের দেয়ালে সাঁটানো ছবিই এখন মানুষের শেষ ভরসা।

নেপালের উত্তরাঞ্চলের রাসুয়া জেলার জায়দাদা গ্রামের বাসিন্দা ইয়াভরাজ লামা তাঁর চার স্বজনকে খুঁজছেন। পুরো গ্রাম ঢলের পানিতে ভেসে যাওয়ায় বেঁচে থাকার আশা প্রায় শেষ। হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী শিশু সিজান তাওয়াং ও তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবি লাগানোর সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমরা স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য এখন ছোট্ট সিজানকে খুঁজে বের করা। সে ছিল এত মিষ্টি আর নিষ্পাপ; সে আর আমাদের সঙ্গে নেই—এ কথা ভাবাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব।’

পাশের দেয়ালে ২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি তাঁর ৩০ বছর বয়সী স্বামী বিশাল নেপালির ছবি সাঁটানোর সময় বিলাপ করছিলেন। ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। বিশাল চালক হিসেবে কাজ করতেন এবং কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যেতেন। দুর্যোগের এক ঘণ্টা আগে রাসুয়ায় হাঁটতে বেরিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তাঁর। চার দিন পার হলেও মনিতা আশা ছাড়েননি, তিনি বলেন, ‘ওকে ছাড়া আমি এ পৃথিবীতে বাঁচতে চাই না। আমার হৃদয় বলছে, সে ফিরে আসবে।’

৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং তাঁর পাঁচ মাস বয়সী ভাতিজিসহ পরিবারের ১২ সদস্যের ছবি নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবার ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে আছে। এত মানুষ চলে গেছে, আর আমরা যারা বেঁচে আছি, তারাও সংগ্রাম করছি।’ জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসায় এখন অন্তত প্রিয়জনদের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।

নিখোঁজদের তালিকায় ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অন্তত ৯০০ জন শ্রমিক রয়েছেন, যাদের অনেকেই কম মজুরির শ্রমিক। এর মধ্যে অন্তত ৬৩ জন ভারতের নাগরিক। নেপালি সেনারা ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের ভেতর ঘন কাদা ভেদ করে জীবিত কয়েকজনকে উদ্ধার করলেও সেনাবাহিনীর ধারণা, অন্তত আরও ১০০ জন এখনো সুড়ঙ্গগুলোতে আটকা পড়ে আছেন। ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভেও আরও কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েছেন। নিখোঁজদের একজন ২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালি, যিনি রাতের শিফট শেষ করে ঘুমানোর সময় পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যান। তাঁর বোন সুশিশা মালুওয়ার প্রতিদিন ট্রমা সেন্টারে আহতদের তালিকায় ভাইয়ের নাম খুঁজছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় ছবি সাঁটিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা হারাইনি। হয়তো কোথাও তাঁকে খুঁজে পাব। হয়তো তাঁকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।’

শেয়ার করুন