কাজের খোঁজে ঢাকায় জনস্রোত, শহর হারাচ্ছে বাসযোগ্যতা

প্রকাশ:

সারা দেশ থেকে উচ্চশিক্ষা, উন্নত জীবন ও কাজের সন্ধানে প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। বিভিন্ন সংস্থার মাঠ জরিপ অনুযায়ী, এই শহর এখন ধারণক্ষমতার চেয়ে ১৩ গুণের বেশি মানুষের বাসস্থান। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে জনসংখ্যার চাপে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলোর সঙ্গে সবার নিচে অবস্থান করছে ঢাকা। উগান্ডা, ইথিওপিয়া ও ঘানার মতো দেশও বাসযোগ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা ঢাকার এই জনস্রোতের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না, বরং আগেরগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় হাজারো কর্মজীবী বেকার হয়ে পড়ছেন। নতুন কর্মসংস্থানের আশায় তারাও এখন ঢাকামুখী হচ্ছেন। রাজধানীতে এসে অনেকেই হকার ও অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তিতেও যুক্ত হচ্ছেন।

নগরবিদদের মতে, ঢাকার অবকাঠামোগত সুবিধা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৮০ লাখ মানুষের বসবাস সম্ভব। বর্তমানে এখানে তিন কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষ বাস করছে, যার ফলে পরিষেবা খাত ভেঙে পড়েছে এবং শহরের অধিকাংশ এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন, ঢাকা দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে এবং এখনই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালান হালিম মোল্লা। তিনি জানান, নিজ এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়া সম্ভব হতো না। বর্তমানে মিরহাজিরবাগ এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে চালাচ্ছেন, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় ব্যাটারি চার্জে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুর, সূত্রাপুর ও সায়েদাবাদ এলাকার ১২টি গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন শত শত নতুন চালক অটোরিকশা চালানোর জন্য আসছেন। গ্যারেজ ম্যানেজাররা জানিয়েছেন, প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার নতুন অটোরিকশা রাস্তায় নামছে, যদিও এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। কমলাপুর, বংশাল, নবাবপুর রোড, বাংলাবাজার, ধোলাইখাল ও বাড্ডার মতো এলাকাগুলোতে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে। পার্টস আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, অটোরিকশার যন্ত্রাংশ মূলত চীন থেকে আসে এবং তাদের আমদানি অর্ডারও কয়েকগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ঢাকার সড়কে অটোরিকশার আধিক্যকে উৎপাত হিসেবে দেখছে। সমিতির সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০ লাখের বেশি অটোরিকশা রাজধানীতে চলাচল করছে, যার মধ্যে ৮০ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশার অনুমোদন রয়েছে; বাকিগুলো অবৈধ। সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক বলেছেন, ঢাকা এখন অবৈধ অটোরিকশা চালকদের দখলে চলে গেছে, যা দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে। তিনি সরকারের অটোরিকশার দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে সীমাহীন ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেছেন।

দেশে নতুন গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, পুরোনো সংযোগে চাপ কম থাকা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। অনেক পুরোনো কারখানা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে অনেক উদ্যোক্তা শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট, যা ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, যা পিক আওয়ারে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি করছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকা ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরের আয়তন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের মাত্র এক শতাংশ। ১৯৭১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ। ২০০০ সালে এটি বেড়ে এক কোটি ৭৪ লাখ এবং সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী তিন কোটি ৬৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের আবাসন প্রোগ্রাম অনুযায়ী, প্রতি একরে ৬০-১২০ জন বসবাস করা উচিত, কিন্তু ঢাকা মহানগরীতে প্রতি একরে গড়ে ৮০০ মানুষ বাস করছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ১৩ গুণ বেশি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং জেলা ও উপজেলায় উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষ আর ঢাকামুখী হবে না।

নগরবিদরা বলছেন, স্বাধীনতার পর ঢাকার ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো তেমন না বাড়লেও জনস্রোত অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অংশ ঢাকায় হওয়ায় বহু গ্রামীণ নারী-পুরুষ কাজের জন্য এখানে আসেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাস্তাঘাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস পরিষেবায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই শহর বড়জোর ৭০-৮০ লাখ মানুষের উপযোগী, কিন্তু সেখানে তিন কোটি ৬৬ লাখ মানুষ পরিষেবা ভাগ করে নিচ্ছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) পরিচালিত জরিপে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি হিসেবে স্থান পেয়েছে। ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ইআইইউ শহরগুলোর বাসযোগ্যতা মূল্যায়নে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—এই পাঁচটি সূচক বিবেচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা ধারাবাহিকভাবে তলানির দিকে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘিঞ্জি এ নগরীতে বর্জ্য সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে, যানজট অন্তহীন ভোগান্তির কারণ এবং অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রায় পাঁচ হাজার বস্তিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় সোয়া দুই লাখ মানুষ বাস করে।

বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, ঢাকা মহানগরী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘নিঃশ্বাস নেওয়ার অবস্থা নেই। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।’ তিনি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর দূষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, শহরগুলোর নদীগুলোকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারলে মানুষ আর ঢাকামুখী হবে না বলে তিনি জানান।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগরপরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকায় মানুষের এই হার বাড়লে নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি মনে করেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনা কাজে আসবে না। সরকার এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা করছে এবং ঢাকার ওপর চাপ কমাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা থেকে ভালো ফল আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতিসংঘের আবাসন প্রোগ্রামের (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) পরামর্শ অনুযায়ী, একটি বাসযোগ্য শহরের প্রতি একরে (৪,০৪৩ বর্গমিটার) ৬০ জন বসবাস করতে পারে। সর্বোচ্চ মানদণ্ডেও এই সংখ্যা ১২০ জনের মধ্যে সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। তবে ৪০০ বর্গ কিমি আয়তনের ঢাকা মহানগরীতে গড়ে প্রতি একরে ৮০০ মানুষ বাস করছে। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ১৩ গুণ বেশি।

সম্প্রতি প্রকাশিত ইআইইউর গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬-এ দেখা গেছে, ঢাকার মোট স্কোর ৪২। ঢাকার নিচে রয়েছে শুধু ত্রিপোলি ও দামেস্ক। তালিকায় ত্রিপোলির অবস্থান ১৭২তম এবং দামেস্ক রয়েছে সর্বশেষ ১৭৩তম স্থানে। ইআইইউ শহরগুলোর বাসযোগ্যতা মূল্যায়নে পাঁচটি সূচক বিবেচনায় নিয়েছেÑ স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরেই বাসযোগ্যতার সূচকে ধারাবাহিকভাবে তলানির দিকে রয়েছে ঢাকা।

শেয়ার করুন