৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ম্যাক্রোঁর |: ফ্রান্সে বিক্ষোভ থেকে দাঙ্গা

প্রকাশ:

ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চরম সহিংসতা ও দাঙ্গা। একাধিক শহরের সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে লুটপাট এবং ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংস সংঘর্ষে নঁত শহরে এক পুলিশ সদস্য এবং প্যারিসের উত্তরাঞ্চলে এক বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া সংঘাতের ঘটনায় ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্য মারাত্মক আহত হয়েছেন। তার ভাষায়, কোনো কিছুই এসব কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সরকারি বিদ্যালয়ের দুরবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত করেছে। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ সদস্যকে এক কিশোরীকে গলা চেপে ধরতে দেখা যায়। চরম বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, রোববারও অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরম কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে, দোকানপাটে লুটপাট চালিয়েছে এবং প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা চালিয়েছে, তাদের আইনগত জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের এর পুরো দায় ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি পরিস্থিতিকে ‘দুটি জগৎ, দুটি বাস্তবতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

সহিংসতার পেছনের উগ্র মতাদর্শকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট বলেন, চরম বামপন্থি গোষ্ঠীর বিদ্রোহী উপাদান ও তাদের সহায়তাকারী অপরাধীরাই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। উদ্ভূত অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে সমগ্র ফরাসি জাতির মনে ক্ষোভ ও লজ্জার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো অজুহাতে এমন তাণ্ডব বরদাস্ত করা যায় না বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। সহিংসতার দৃশ্য দেখে ফরাসিদের মধ্যে ক্ষোভ ও লজ্জা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন ম্যাক্রোঁ।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের সঙ্গে ভাঙচুর ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কারণ বহু মানুষ নিজেদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া তুলে ধরতেই রাজপথে নেমেছিলেন। সাধারণ জনগণের অভিযোগ ও ক্ষোভ অনুধাবনের গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, চলতি সপ্তাহেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। এ সপ্তাহে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সপ্তাহান্তের সংঘাতে নঁত শহরে ২২ বছর বয়সি এক পুলিশ সদস্য তৃতীয় পক্ষের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। অন্যদিকে প্যারিসের উত্তরের ঘটনায় বিএফএমটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়, আটক বিক্ষোভকারীর হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সংঘাতের জের ধরে সারা দেশ থেকে দুই হাজারের বেশি অরাজকতাকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। প্যারিস থেকে প্রায় ২৫০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত শহরটিতে ওই পুলিশ সদস্য ‘তৃতীয় পক্ষের একটি গাড়ির ধাক্কায়’ প্রাণ হারান। বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু প্যারিস, লিয়োঁ ও মার্সেইয়ের মেয়রদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সপ্তাহের শুরুর দিকে পুলিশের অভিযানে ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যায়। শনিবার লিয়োঁ থেকে প্রায় ৪০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে সাঁত-এতিয়েন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে এক ব্যক্তি হাত হারিয়েছেন বলে বিএফএমটিভিকে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।

গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানের পর প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে আবারও জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। সেখানে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। দেশটির লিমোজ শহরে শনিবার ১৪৩ বছরের প্রাচীন টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা, যার চূড়া ভেঙে পড়েছে। মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরেও দফায় দফায় অরাজকতা সৃষ্টি হয়। খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারেফোরের প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্র বোমপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, সহিংসতায় দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্সেই শহরে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে ঢুকে ভাঙচুর চালান। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতে আরো সহায়তা চেয়েছেন ওই মেয়ররা। তাদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার।

এদিকে সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আইনপ্রণেতা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সমালোচনা বাড়ছে। শনিবার রাতে প্যারিসের বিভিন্ন পয়েন্টে তরুণদের দল লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানান, দাঙ্গাকারী ও পুলিশের ওপর আক্রমণকারীদের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পিছু হটবে না এবং সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেবে। তাদের কর্মীরা সাহস ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও দাবি করা হয়।

উল্লেখ্য, ফ্রান্সে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের গোড়াপত্তন ঘটে শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে।

শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমানো, শিক্ষক নিয়োগে বরাদ্দ বাড়ানো ও জলবায়ু উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন শুরু করে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়। গত মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। গত দেড় দশকে জন্মহার বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষকসংখ্যা কমেছে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, গত শনিবার ফ্রান্সে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও দাবি

  • সামাজিক বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ: ৩৬ বছর বয়সি বিক্ষোভকারী পলিন জানান, তরুণদের সমর্থন দিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। কিছু ক্ষেত্রে অর্জন হলেও সার্বিক পরিস্থিতি সঠিক পথে এগোচ্ছে না।
  • গণতন্ত্র ও ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন: ৩৮ বছর বয়সি লুইস অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর শাসনামলে দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হচ্ছে এবং ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে।
  • গণমাধ্যমের মালিকানা: বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের হাতে গোনা কয়েকজন ধনকুবের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতেই তারা রাজপথে লড়াই করছেন।

ইতালির মিলান শহরেও এই বিক্ষোভের রেশ দেখা গেছে। সেখানে পাথর নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের সরাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। স্কাই টিজি২৪ জানায়, মিলানের সুপারমার্কেটে হামলা ও ভাঙচুরের পর ৭০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি এ ধরনের সহিংসতা ও লুটপাটের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং অরাজকতা রুখতে সোমবার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য মাত্রার সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ এক ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। তবে অন্য কয়েক ধরনের গ্রেনেড ব্যবহারের অনুমতি বহাল ছিল।

শেয়ার করুন