দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার পর ক্ষমতায় ফেরার পরপরই বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং ছাত্রদলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্পষ্ট আভাস দিয়েছেন দলের হাইকমান্ড। নতুন কমিটি গঠনের অপেক্ষায় থাকা এসব সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে এখন স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং একজন ব্যতীত সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই দল পুনর্গঠনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। ওদিকে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে।
কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ হিসেবে দলের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ এবং ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব খোঁজার বিষয়টি সামনে আসছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে চাঁদাবাজি ও দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ড চাচ্ছেন, নতুন কমিটিতে তরুণ ও মেধাবীদের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখা পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে। সংগঠনকে গতিশীল করা এবং ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে প্রতিটি পদ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করার ঘটনাও এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ। তবে কমিটি গঠনে রাজপথের আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও পরীক্ষিত নেতারা অগ্রাধিকার পাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে দখল, চাঁজাবাজি এবং বিতর্কিতরা কমিটিতে জায়গা পাবেন না বলেও সূত্রটি জানায়। সম্প্রতি বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের শূন্য পদগুলো পূরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে বিগত দিনে রাজপথের আন্দোলন ও সংগ্রামে ভূমিকাসহ দলের প্রতি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
ছাত্রদলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। চলতি বছরের ১লা মার্চ বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিএনপির প্রধান শীর্ষ নেতাদের ডেকে নতুন কমিটি গঠনের বার্তা দিয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ফেসবুকে পোস্টের মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে তিন মাস অতিবাহিত হলেও নতুন কমিটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে নাছির উদ্দিন নাছির জানিয়েছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখনই নতুন কমিটি ঘোষণা করতে চাইবেন, তখনই তা কার্যকর হবে। একইভাবে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান জানিয়েছেন যে, কমিটি গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলটির সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানই দেবেন।
সাংগঠনিক পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পদে হাসান জাফির তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শহিদুল ইসলাম বাবুলের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এদিকে ২০২৪ সালের ১লা মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে নিয়ে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি গঠিত হয়। অন্যদিকে যুবদলের নতুন কমিটি নিয়ে দাপ্তরিক পর্যায়ে এখনও আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে ঢাকা মহানগর উত্তরের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছেন যুবদলের দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল।
দলীয় কাউন্সিল নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও এই বছর তা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ডিসেম্বরে সম্মেলনের কথা বললেও বর্তমানে আগামী বছরের জানুয়ারিতে কাউন্সিলের সম্ভাবনা দেখছে নীতিনির্ধারকরা। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল। এবার কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গতানুগতিক নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার ধারা থেকে দলকে বের করে আনবে। রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারিত না হলেও খুব শিগগিরই তা অনুষ্ঠিত হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের ওপর জোর দিচ্ছে দলটি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হামলা-মামলায় তা সম্ভব হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কাউন্সিলের উদ্বোধন করেছিলেন।





