১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজা থেকে কাশ্মীর: সামরিক অস্ত্রের ভয়ংকর বিস্তার ও প্রভাব

প্রকাশ:

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব উইপনস অ্যান্ড অ্যামুনিশনস টু ইসরাইল’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান চলাকালীন সময়ে ভারত কয়েক লাখ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের বিভিন্ন উপাদান ইসরাইলে সরবরাহ করেছে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে জানিয়েছে, এই ধরনের রপ্তানি ইসরাইলের চলমান সামরিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকা রাখার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরি করছে।

অস্ত্র বা প্রাণঘাতী প্রযুক্তির এই বিস্তার কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়নের নতুন নতুন নজির তৈরি হচ্ছে। ভারতের দিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দমনে পুলিশ যেভাবে পেলেট গানের ব্যবহার করেছে, তা এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। এই ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন এবং একজন তরুণের স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে প্রাণঘাতী প্রযুক্তি ও অস্ত্র কীভাবে রপ্তানি বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, বিপদ শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনাও ওই সময়ের পর ঘটে।

কাশ্মীর থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত জনতা নিয়ন্ত্রণে পেলেট গানের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়া এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র শেষ পর্যন্ত অন্যান্য জনপদেও পরীক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ভারত ২০১০ সালে কাশ্মীরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে পেলেট গান ব্যবহার শুরু করে, যা当时 ‘কম প্রাণঘাতী’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অস্ত্রের আঘাতে ২৪ জনের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দমনে পেলেট গানের ব্যবহার চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ‘কম প্রাণঘাতী’ হিসেবে পরিচিত হলেও পেলেটগুলো এতটাই ধারালো যে তা চামড়া ভেদ করে শরীরে আটকে থাকতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধাতব পেলেটের আঘাতে ১৮ জন নিহত, ১৩৯ জন অন্ধ এবং ২ হাজার ৯৪২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৫৯ জনের চোখে মারাত্মক জখম হয়েছিল। পেলেট গান মূলত পাখি শিকারের জন্য ১২-বোরের পাম্প-অ্যাকশন শটগানে ব্যবহার করা হয়। একটি কার্তুজে শত শত ধাতব বল বা পেলেট থাকে, যা ছোড়ার পর প্রতি সেকেন্ডে ১০০ থেকে ১৫০ মিটার গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের মধ্যে ১ হাজার ৪৫৯ জনের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে।

এই অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বাছাই করা সম্ভব হয় না; বরং ঘরের জানালায় থাকা কিশোরী থেকে মায়ের কোলে থাকা শিশুও এর অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণের শিকার হতে পারে। এ ধরনের অস্ত্র শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জন্য স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও মানসিক ক্ষত বয়ে আনে। অথচ নিরাপত্তাজনিত যুক্তি ও ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনের অজুহাতে এমন প্রাণঘাতী অস্ত্রকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে জনতার মধ্যে একটি গুলিতেই একাধিক মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, কথিত সহিংস বিক্ষোভকারী আর ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অস্ত্র কোনো পার্থক্য করে না।

দিল্লির ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাসবাদী নয়। কিন্তু কাশ্মীর, মণিপুর কিংবা পাঞ্জাবের কৃষকদের ক্ষেত্রে যেভাবে বৈষম্যের নীতি প্রয়োগ করা হয়, তা রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ভারতের কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো পেলেট ব্যবহারের নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও কারণ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি চেয়েও কোনো উত্তর পায়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এ বিষয়ে কঠোর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে বিষয়টি মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

এই অস্ত্রের ভয়াবহতা কেবল ভারত ও কাশ্মীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘দ্য ট্রাবলস’ সংঘাতের সময় যুক্তরাজ্য প্রথম প্লাস্টিক পেলেট ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করে, যা পরে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীও গ্রহণ করে। ২০১৯ সালে চিলিতে বিক্ষোভে পেলেটের আঘাতে ২৩০ জন দৃষ্টিশক্তি হারান। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দমনে এর ব্যবহারে ২২ জন নিহত এবং অন্তত ৪০০ জন অন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভেও পেলেট গানের ব্যাপক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পেলেটের আঘাতের অন্তত ৭৪টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যার একটিতে এক ব্যক্তির ডান বুকের ভেতর ১৭৪টি পেলেট ঢুকে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করে। গাজা ও কাশ্মীরের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ব্যবহৃত এই অস্ত্রগুলো এখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ নাগরিকদের দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রগুলোর জন্য জবাবদিহির অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

শেয়ার করুন