৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিম জং–উনের মৃত্যু নিয়ে কেন বারবার ছড়ায় গুজব

প্রকাশ:

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে গুজব ছড়িয়েছিল। কিম জং–উন কতটা বিলাসী জীবনযাপন করেন, অবকাশকেন্দ্রের কাছে বড় বড় বিলাসবহুল নৌযান কি তাঁর।

দাবি করা হয়েছিল, মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণের কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

তবে এই গুজবের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘রোদং সিনমুন’-এ কিম জং–উনের নতুন ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। আবার দেশটির নেতার কাছে নিয়মিত যাওয়ার সুযোগ খুব অল্পসংখ্যক মানুষের আছে।

৪২ বছর বয়সী কিমকে ছবিতে বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে এবং তিনি তাঁর মেয়ে কিম জু আয়ের সঙ্গে একটি পোশাক ও জুতার প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন। যদিও ছবিগুলো ঠিক কোন সময়ে তোলা হয়েছে, তার নিশ্চয়তা নেই।

এই গুজবের সূত্রপাত মূলত ওয়ানজুন শিয়ে নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে, যিনি নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর কিমকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বেইজিং নেওয়া হয়েছিল। তবে শিয়ে তাঁর এই দাবির পক্ষে কোনো ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। এর আগেও তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মৃত্যু নিয়ে একইভাবে প্রমাণহীন তথ্য ছড়িয়েছিলেন। দলটি চীনা কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে। পরে কিমের মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ গোপনে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এসব প্রশ্নে বেইজিং ও সিউল উদ্বিগ্ন।

উত্তর কোরিয়ার মতো বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা রাষ্ট্রে সঠিক তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই সুযোগেই বিভিন্ন সময় দেশটির শাসককে ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়। অতীতে ২০২০ সালেও কিম জং–উনের মৃত্যু নিয়ে জোর গুজব ছড়িয়েছিল, যখন হৃদ্‌রোগের অস্ত্রোপচারের পর তিনি জনসমক্ষে আসছিলেন না। সে সময় পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি প্রায় ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে তাঁর মৃত্যুর দাবি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যুর খবরের সপক্ষে কোনো তথ্য নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন কোনো বড় ঘটনা ঘটলে চীন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার বা কূটনৈতিক মিশনগুলোতে তৎপরতা বাড়ার কথা ছিল। এছাড়া চীনের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকেও এমন কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা কিংবা শরণার্থীর ঢল সামাল দিতে চীন উত্তর কোরিয়া সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারত। কিন্তু এবার এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তিন কিমের ৭৮ বছর: যেভাবে টিকে আছে উত্তর কোরিয়া।

কিমের মৃত্যু নিয়ে বারবার গুজব তৈরির মূল কারণ দেশটির ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা। অতীতে কিম ইল সুং কয়েক দশক ধরে ছেলে কিম জং ইলকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করেছিলেন, ফলে ১৯৯৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল নির্বিঘ্ন। তবে বর্তমান নেতা কিম জং–উনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ভিন্ন। ২০০৮ সালে বাবার স্ট্রোকের পর কিম জং–উনকে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হয় এবং ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর আগেই তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার দেশটি শাসন করছে। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও সামরিক প্রদর্শনীতে মেয়ের উপস্থিতিও বেড়েছে। অল্প বয়সের কারণে ক্ষমতার লড়াইয়ে তিনিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে এ অনিশ্চয়তার কারণে কিমের স্বাস্থ্য সম্পর্কে যেকোনো খবর বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে কট্টরপন্থীরা কি আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারেন। যেন যেকোনো আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত থাকতে পারে।

বর্তমানে কিম জং–উন তাঁর মেয়ে কিম জু আয়েকে উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলছেন বলে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা। তবে ১৩ বছর বয়সী কিম জু আয়ের উত্তরসূরি হওয়ার পথটি অনেক চ্যালেঞ্জের। উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে কখনো কোনো নারী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেননি, এছাড়া তাঁকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

কিমের অতিরিক্ত ওজন এবং প্রচুর ধূমপানের অভ্যাস নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, কিমের জীবনযাত্রা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার বংশগত ইতিহাস রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের নেতৃত্বে কোনো আকস্মিক সংকট তৈরি হলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অস্থিরতার কারণে শরণার্থী সংকট, চীন সীমান্তে উত্তেজনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা প্রায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কিমের স্বাস্থ্য ও গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে।

পরিশেষে, ওয়ানজুন শিয়ে বা অন্যদের ছড়ানো এসব তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। অনেক সময় উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী নিজেরাও বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়। নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব এবং উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, ততদিন কিম জং–উনের স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থামার সম্ভাবনা কম। তবে কিম জং–উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা তাঁর পূর্বসূরিদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত।

শেয়ার করুন