নাগোয়ার মাঠে এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩১ রানের পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলকে। ১৪৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিসুলভ ব্যাটিং করতে ব্যর্থ হয়েছে। পাওয়ার প্লের প্রথম ছয় ওভারে মাত্র ২৪ রান সংগ্রহ করতে পারায় শুরুতেই চাপে পড়ে যায় দলটি। পুরো ইনিংস জুড়ে বড় শট খেলার অভাব ছিল স্পষ্ট, যার ফলে শেষ পর্যন্ত পদক স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের।
ম্যাচশেষে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করেছেন কোচ সারোয়ার ইমরান। তার দাবি, টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কোচ ও অধিনায়কদের ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা দলের খেলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাওয়ার প্লেতে রান না পাওয়ার পেছনে সমালোচকদের ভূমিকা দেখছেন তিনি। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলাই পেশাদারিত্বের অংশ, যা এই ম্যাচে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি শুধু এই একটি ম্যাচের ব্যর্থতা নয়। এর আগে এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৪০ রানে হারের পর এশিয়ান গেমসেও বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতার পেছনে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা প্রকট। বাউন্ডারি লাইনের কাছে বারবার ক্যাচ দেওয়া কিংবা ব্যাটিংয়ে প্রয়োজনীয় গতি না থাকা—সব মিলিয়ে দলটি যেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের চাহিদার সাথে খাপ খাওয়াতেই হিমশিম খাচ্ছে।
দলের ভেতরেও নেতৃত্বের সংকট স্পষ্ট ছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অধিনায়ক জ্যোতি ইমেইলযোগে বিসিবিকে টি-টোয়েন্টি নেতৃত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। একইসাথে আগামী মাসে কোচ সারোয়ার ইমরানের চুক্তি শেষ হচ্ছে এবং বোর্ড তাকে আর না রাখার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন গুঞ্জনও খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কোচ ও অধিনায়কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে বলে ইমরানের ভাষ্য।
এদিকে কোচ ইমরান বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। স্কুল ক্রিকেটের অভাব, ঘরোয়া কাঠামোর দুর্বলতা এবং প্রতিভা তৈরির ঘাটতির কারণে শ্রীলঙ্কার মতো দলের সাথে বাংলাদেশের আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এসব দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান না করলে শুধু একটি ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স আশা করা কঠিন।
তবে কাঠামোগত দুর্বলতা আর মাঠের নির্দিষ্ট ভুলগুলো এক নয়। ১৪৫ রান তাড়া করতে গিয়ে কেন মাঝের ওভারে রানের গতি বাড়ানো যায়নি বা কেন বড় শট খেলেনি—এই উত্তরগুলো মূলত মাঠের পারফরম্যান্সের সাথেই সম্পর্কিত। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়া বা চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভার সবসময়ই কোচিং স্টাফ ও দলের নেতৃত্বের ওপর থাকে।
সমালোচনা বা চাপের মুখেই পারফরম্যান্সের প্রমাণ দেওয়া একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের মূল পরীক্ষা। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত ফল আসছে না, তখন জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখা যুক্তিসঙ্গত নয়। অতীতে এই এশিয়ান গেমস থেকেই স্বর্ণপদক জয়ের গৌরব অর্জন করেছিল বাংলাদেশ, অথচ সেই দল এখন পদকহীনভাবে ফিরছে।
এখন সময় এসেছে নতুন করে সব কিছু শুরু করার। নতুন অধিনায়ক, নতুন কোচ এবং নতুন পরিকল্পনার সাথে একটি নতুন যাত্রার প্রয়োজন। তবে পুরোনো প্রশ্নগুলো এবং ব্যাটিংয়ের দৈন্যদশা দূর না করলে শুধু পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। সমালোচনার জবাব মাঠেই ব্যাটে-বলে দিতে হয়, যা এই ম্যাচে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল।
নাগোয়ার মাঠে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের উদযাপনের বিপরীতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিঃশব্দে মাঠ ছাড়া এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। হাতে ধরা স্কোরকার্ডে ৩১ রানের পরাজয়ের ক্ষত নিয়ে এখন দেশে ফেরার পালা। ব্রোঞ্জের মঞ্চ থেকেও খালি হাতে ফেরা বাংলাদেশ নারী দলকে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হবে।
সব দায় সমালোচনার ওপর চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। ব্যাটিংয়ের উন্নতির জন্য এবং বড় শট খেলার সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে কঠোর পরিশ্রম ও প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা দল হিসেবে অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এই জিরো পারফরম্যান্স নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।
আগামী দিনগুলোতে নতুন কোচ ও অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণের পর দলের ব্যাটিং শৈলী ও মানসিকতায় কতটা পরিবর্তন আসে, সেটাই দেখার বিষয়। সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের প্রমাণ করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাওয়ার প্লেতে মাত্র ২৪ রান হওয়া, বড় শট না আসা, ছক্কা মারতে না পারা—এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনাকেও দেখালেন দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলার কারণ হিসেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৪৫ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা টি-টোয়েন্টি ধাঁচের হলো না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘টুর্নামেন্টের আগে হেড কোচ আর ক্যাপ্টেনদের সাইজ করে দিলেন, তাহলে কীভাবে ভালো পারফরম্যান্স আশা করেন?’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ মাথা নিচু করে ড্রেসিংরুমের দিকে ফিরছেন, কেউ ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমন একটি হারের পর মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে কোচ সারোয়ার ইমরানের মুখে প্রথমেই এলো ‘বাইরের চাপ’-এর প্রসঙ্গ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু নাগোয়ার খারোগি অ্যাথলেটিক্স পার্কের মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার সময় প্রশ্নটা থেকেই গেল—সত্যিই কি বাইরের চাপেই হেরেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাকি মাঠের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পর এখন চারপাশ থেকে ‘কারণ’ এনে ব্যাখ্যাটা একটু সহজ করে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।





