৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইফোন ও ভাতের পাতে প্রাণহানি: সামাজিক অবক্ষয়ের চরম পরিণাম

প্রকাশ:

আজকের সমাজব্যবস্থায় মানুষের জীবনের চেয়ে জড়বস্তুর মূল্য যেন বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি ও তথাকথিত আধুনিকতার চাকচিক্যের নিচে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বোধ। কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং খুলনার ছাত্র মো. আজমুল হোসেনের অকাল মৃত্যু আমাদের বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। কুমিল্লার ঘটনাটি ঘটে যখন অপ্রতিম তার মায়ের আইফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। মায়ের আইফোনটির প্রতি মোহ থেকে জন্ম নেওয়া সেই নৃশংসতায় অপ্রতিমের নিস্পন্দ দেহ উদ্ধার হয় লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে। অপ্রতিম ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। অন্যদিকে খুলনায় ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মো. আজমুল হোসেন মাত্র ১০ দিন আগেই স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। মেসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ মতো তুচ্ছ ও বিতর্কিত অভিযোগে তাকে মারধর করে চারতলার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী অপ্রতিমের লাশ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি স্বীকার করেন, একটি আইফোনের জন্য শিশুকে এভাবে হত্যার ঘটনা চরম লজ্জাজনক এবং তিনি একজন প্রতিনিধি হিসেবে এর দায় এড়াতে পারেন না। একইসাথে খুলনার আজমুল হত্যার ঘটনায় পরিবারটির অসহায়ত্ব আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতিকে ফুটিয়ে তোলে। আজমুলের কৃষক বাবা কুতুব উদ্দিনের আর্তনাদ—‘আমরা গরিব মানুষ, বিচার পাব না’—আমাদের রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। অপরাধীরা আজমুলের মৃত্যুর পর তার পরিবারের কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা দাবি করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল, যা আইনের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র ভয়ের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে।

আমাদের সমাজে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। চুরির সন্দেহ কিংবা সামান্য উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঘটনায় পিটিয়ে হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাগুলো নিয়মিত সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ কেবল সনদসর্বস্ব ডিগ্রির কারখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মানবিক মূল্যবোধ বা সহনশীলতার চর্চা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। পরিবার ও সমাজের এই সামগ্রিক অবক্ষয় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অশনি সংকেত বহন করছে।

এই অমানবিকতা রুখতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, অপ্রতিম ও আজমুল হত্যার সাথে জড়িতদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। সংসদ সদস্যের প্রস্তাবের মতো সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মব জাস্টিস বন্ধ করতে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে কেবল বস্তুগত সাফল্যের বদলে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পরিশেষে, বিচারব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে এবং দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় হতে হবে। দুটি তরতাজা জীবনের অকাল প্রস্থান আমাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা, যার সমাধান ছাড়া মানবিক সমাজ গঠন অসম্ভব। চাকরির আরও তথ্য: আমরা আজ কেমন এক নিথর, পাষাণ ও সংবেদনহীন সমাজে বাস করছি, যেখানে ধাতব ও প্লাস্টিকের একটি যন্ত্র কিংবা এক থালা ভাতের চেয়ে মানুষের জীবনের দাম সস্তা হয়ে গেছে। চাকরির আরও তথ্য: প্রশ্নটি কোনো অলঙ্কারিক সাহিত্য কিংবা কবিতার রূপক নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নগ্ন, রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় বাস্তবতা। চাকরির আরও তথ্য: বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি, চারপাশের চোখধাঁধানো ভৌত অবকাঠামো, জিডিপির অঙ্কের বৃদ্ধি আর আধুনিকতার চাকচিক্যের নিচে আমাদের সমাজব্যবস্থা ভেতর থেকে কতটা পচে গলে গন্ধ ছড়াচ্ছে, তা প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাকরির আরও তথ্য: যখন একটি দামি ফোনের প্রলোভনে কিংবা একমুঠো চাল-ভাতের অপবাদে দুটো উদীয়মান, সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণ নির্মমভাবে ঝরে যায়, তখন আমাদের জাতীয় বিবেক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রশ্ন তোলে—সত্যিই কি এই দেশে মানুষের প্রাণের কোনো মূল্য অবশিষ্ট আছে। চাকরির আরও তথ্য: নাকি আমরা এমন এক সভ্যতায় রূপ নিয়েছি, যেখানে মাংস আর রক্তের চেয়ে জড়বস্তুর মূল্য অনেক বেশি। চাকরির আরও তথ্য: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি পৃথক অথচ হুবহু এক সুতোয় গাঁথা হিংস্রতার ঘটনা আমাদের সমাজকে আবারও চরম লজ্জার মুখে দাঁড় করিয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: মাত্র এক টুকরো কৃত্রিম প্রযুক্তির লোভে সেই অবুঝ শিশুটির মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হলো। চাকরির আরও তথ্য: অন্যদিকে, রূপসা-ভৈরব পারের শহর খুলনায় ঘটে গেল আরেক মধ্যযুগীয় বর্বরতা।

শেয়ার করুন