আনোয়ারায় চীনা বিনিয়োগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা আজ

প্রকাশ:

আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠান আজ সোমবার (২৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রাউন্ডব্রেকিং কেবল একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণ কাজ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রকল্পটি মূলত বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। ২০১৪ সালে সমঝোতা হলেও ডেভেলপার নির্বাচন ও অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি ঝুলে ছিল। ২০২২ সালে চীনা সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) এর ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে এবং গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।

একই সফরে মোংলা বন্দরের পাশে নতুন চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বিডা ও চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতার চুক্তি এবং কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ২২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে। প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার জেটি, চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে এবং প্রথম তিন বছরের মধ্যেই ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট প্রস্তুত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে বস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্য-প্রযুক্তি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে নতুন গতির সঞ্চার হবে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় প্রায় ৯২১ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

চীনা বিনিয়োগের প্রবণতাও এখন বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভূমি ইজারা চুক্তি করেছে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৭১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানই চীনা মালিকানাধীন বা চীনা যৌথ উদ্যোগের, যাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। পোশাক খাতের বাইরে ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, কপার পণ্য, মেডিক্যাল ডিভাইস, লজিস্টিকস ও হাইড্রোপনিক প্রযুক্তিতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।

শেয়ার করুন