ওপেক সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৪০ ডলারে নামার আশঙ্কা

প্রকাশ:

ইরান যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতির পাশাপাশি ওপেকের মতো শক্তিশালী তেল উৎপাদনকারী জোটের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো এই জোটটি এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেমেছে। এই বসন্তে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়ায় ওপেকের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উৎপাদন বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে, যা পুরনো কোটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কোটা বিতর্কের জেরে গত এপ্রিল মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট ত্যাগ করে। বর্তমানে ওপেক একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে—জোট টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তেলের বাজার ধসিয়ে দেওয়া, নাকি মুনাফা বাড়াতে গিয়ে জোটের ভাঙন ত্বরান্বিত করা। ইরান, ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহ করতে না পেরে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। এখন হরমুজ প্রণালি সচল হওয়ায় ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরাক তাদের উৎপাদন কোটা বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ইরাকের তেল বিষয়ক মন্ত্রী ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো না হলে তাদের ওপেকের সদস্যপদ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইরাক তাদের তেল উৎপাদন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল থেকে এপ্রিল-মে মাসে ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চায়। তারা এখন দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উত্তোলনের অনুমতি চাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়।

তবে এই সংকটে মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সৌদি আরবের হাতে। সৌদির হুট করে উৎপাদন বাড়ানোর তাড়া নেই, কারণ যুদ্ধের সময় তারা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে প্রায় ৬০ ভাগ ব্যবসা সচল রাখতে পেরেছিল। সৌদি আরব বাজার স্থিতিশীল রাখার পক্ষে, কারণ বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হওয়ার আগে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দিলে দাম ও মুনাফা তলানিতে ঠেকতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় ওপেক প্লাস সম্প্রতি দৈনিক মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় তেলের দাম ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা কমেছে, যা এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপ বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ায় তেলের চাহিদা আগের অবস্থায় নাও ফিরতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জরুরি তেলের মজুদ ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল কমলেও ২০২৭ সালের আগে বড় ধরনের কেনাকাটার সম্ভাবনা কম। যদি ওপেকের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ে, তবে আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে ৫০ ডলারে নেমে আসতে পারে। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে এবং সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান উৎপাদন বাড়িয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪০ ডলারের ঘরে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা সৌদির মতো ধনী দেশের জন্য সহনীয় হলেও অন্য সদস্যদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।

শেয়ার করুন