বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি তার মূল লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের সময় থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার আধুনিক রূপ ১৬৪৮ সালের পর থেকে বিকশিত হয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্বার্থকেন্দ্রিক ও বাস্তবমুখী হয়ে ওঠায় পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের বাইরে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করতেই মূলত এই নীতি গ্রহণ করে থাকে।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’। তবে এই নীতি জাতীয় স্বার্থকে কতটুকু প্রতিফলিত করছে, তা এখন পর্যালোচনার দাবি রাখে। ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুন্নত দেশগুলোকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রোষানল থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করলেও, তা যেন দেশের স্বার্থের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নামে যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা মূলত সময়ের প্রয়োজনে একটি সংশোধিত প্রয়াস। তবে এই নীতির প্রকৃত প্রতিফলন নিয়ে জনমনে ও বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশগুলো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি সংশোধন করেছে, তারা পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৭৫ সালে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হওয়ার পর তারা পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের পরিবর্তে নিজেদের চিন্তাপ্রসূত নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে আজ তারা সুশাসন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সূচকে অনেক এগিয়ে রয়েছে, যা আমাদের জন্য গবেষণার বিষয়।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কৌশলগত দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত বিতর্ক বা আমদানি-রপ্তানির দরকষাকষিতে ছাড় দেওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির হিস্যা আদায়ে কয়েক দশকের ব্যর্থতা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। প্রতি বছর ভারত কর্তৃক পূর্ব অবহিতকরণ ছাড়াই পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে সৃষ্ট বন্যা মোকাবিলায় কার্যকর আলোচনার অভাবও উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ও সমমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রকৃত সার্থকতা।




