শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর, ধরাছোঁয়ার বাইরে হোতারা

প্রকাশ:

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান কোনোভাবেই থামছে না। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এড়াতে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল ও পাচারের পথ পরিবর্তন করছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো হোল্ড, বিমানের টয়লেট, ফলের ক্যারেট থেকে শুরু করে যাত্রীর শরীর—সবই এখন চোরাচালানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে দু-এক কেজির চালান ধরা পড়লেও বর্তমানে একেকটি চালানে ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত স্বর্ণ মিলছে, যা বিমানবন্দরটিকে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি নিরাপদ করিডোরে পরিণত করেছে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। জব্দকৃত স্বর্ণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ সালে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ সালে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ সালে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৭০ কেজির কিছু বেশি স্বর্ণ জব্দ হয়। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণ থেকে ২,০৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থানায় স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে ৫৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, স্বর্ণ পাচারে অর্ধশতাধিক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। কখনো যাত্রী, আবার কখনো বিমান-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, বৈদ্যুতিক মোটর, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, মানিব্যাগ, সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টার, ওষুধের পাত্র, কোমরের বেল্ট, জুতা, শার্টের কলার, হুইলচেয়ার ও লকেটের ভেতরে লুকিয়ে স্বর্ণ আনার ঘটনাও ধরা পড়েছে। এসব ঘটনায় কেবিন ক্রু, পাইলট, প্রকৌশলী, ট্রলিম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিগত সরকারের সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ায় অবস্থানকারী অন্তত এক ডজন বাংলাদেশি এই চোরাচালানচক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। এতে সিভিল অ্যাভিয়েশন, কাস্টমস, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ইউনিট, পুলিশ ও আনসারের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চলতি বছর শাহজালালে বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়েছে। ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। ২ জুলাই বিমানের আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম এবং ১৯ জুলাই হংকং থেকে আসা ক্যাথে প্যাসিফিকের কার্গো ফ্লাইটের ফলের ক্যারেট থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরের গোলচত্বরে পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে এক কেজি ৮১২ গ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যায়।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরে সংঘবদ্ধ সহযোগিতা ছাড়া এত বড় চালান আসা অসম্ভব। শুধু বাহক আটক করে এ অপরাধ বন্ধ করা যাবে না; পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। তিনি আধুনিক স্ক্যানিং, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং কর্মকর্তাদের রোটেশন জরুরি বলে মনে করেন। বিমানবন্দরের ব্যাগেজ রুল হলো, একজন যাত্রী বিদেশ থেকে আসার সময় ঘোষণা দিয়ে এক বছরে মোট ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণালংকার শুল্ক পরিশোধ ছাড়া নিয়ে আসতে পারেন। অন্যদিকে একজন যাত্রী স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিণ্ড সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ তোলা পর্যন্ত আনতে পারেন। প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম স্বর্ণবারের জন্য ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ধরা হয়েছে। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম তালুকদার জানান, দুবাই রুটের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে এবং দ্রুতই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন