দ্বৈত নাগরিকত্ব ও সরকারি পদে থাকার আইনি জটিলতা ও বিতর্ক

প্রকাশ:

বাংলাদেশের কোনো নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের পর সরকারের নীতিনির্ধারণী পদ, জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী-উপদেষ্টা হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক ও আইনি ধোঁয়াশা বিদ্যমান। সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সংবিধান ও নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিমালার সাংঘর্ষিক ব্যবস্থার কারণে এই আইনি সংকট দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনে ভিন্নতা রয়েছে। কিছু দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় আগের দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়, আবার কোথাও দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রাখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় রাখতে হলে আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা নির্বাচন করার যোগ্যতা হারাবেন। তবে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকত্বের ধারায় নতুন ব্যাখ্যা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতির জটিলতা বেড়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। এই ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে অনেক দ্বৈত নাগরিক বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের প্রমাণপত্র দাখিল করে আসছেন। এ নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে যে—দ্বৈত নাগরিকরা যেহেতু একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও নাগরিক, তবে কি তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বা মন্ত্রী হওয়ার অধিকার রাখবেন?

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও সরকারি পদ নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে আইন ও নিয়ম শিথিল করার নজির রয়েছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে যখন জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন সরকারি পদের জন্য নিজের বা স্পাউসের বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার আইনি বাধা ছিল। তার স্ত্রী রাশিয়ার নাগরিক হওয়ায় তৎকালীন সিভিল সার্ভিস আইন ও বিধিমালার সংশ্লিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে আপিল বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী এবং বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকা নিয়েও ব্যাপক রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। বিচার বিভাগীয় পদে থেকে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রাখা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এছাড়া হাসিনার সরকারের সময়ে অনেক এমপি প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে দ্বৈত নাগরিকরা নির্বাচন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে যুক্ত হওয়া ধারার ব্যাখ্যাটি দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে, কারণ তারা একই সাথে বাংলাদেশেরও নাগরিক।

শেয়ার করুন