ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: বিভক্ত মার্কিন ফুটবলপ্রেমীরা

প্রকাশ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ এটিকে ভুল সিদ্ধান্তের সংশোধন হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন- এতে বিশ্বকাপের ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই হস্তক্ষেপের কারণে ফিফার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ কমছে না।

গত সপ্তাহে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের গোড়ালিতে বিপজ্জনক ট্যাকল করায় বালোগানকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এর ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচ থেকে তিনি নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করার পর সংস্থাটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এবং বালোগানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেন।

এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নারী ফুটবলার ও টিভি বিশ্লেষক জুলি ফাউডি। তিনি বলেন, ‘আপনি ফিফা সভাপতিকে ফোন করে নিয়ম বদলে দিতে পারেন না। বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে ফুটবল একটি আবেগের বিষয়। খেলায় ন্যায্যতার অনুভূতি নষ্ট হলে বিশ্বকাপের বিশেষত্বও হারিয়ে যায়।’

অন্যদিকে, আলাবামার বার্মিংহামের স্কুল ফুটবল কোচ প্যাট্রিক ম্যাকডোনাল্ড এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ‘একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়েছে। এতে আমার দলেরই লাভ হয়েছে এবং আমি এতে খুশি।’

তবে সিয়াটলে অবস্থানরত ২৩ বছর বয়সী ফুটবলপ্রেমী ইথান অ্যাঙ্গেলকেন তার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘বালোগান খেলতে পারবে বলে আনন্দিত, কিন্তু একই সঙ্গে হতবাক ও বিভ্রান্তও।’ তার মতে, এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র জিতলেও সেই জয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত। আটলান্টার যুব পাদ্রি জন রিড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হয়েছে বলে আমি খুব একটা বিরক্ত নই। তবে রাজনীতিবিদদের ফুটবলে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফিফা নিজেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। এর মধ্যে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের বিতর্কিত বিড প্রক্রিয়া এবং প্রায় ১৫ কোটি ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির কারণে তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের পদত্যাগ উল্লেখযোগ্য।

জর্জিয়ার স্টোনক্রেস্টের বাসিন্দা চার্নিটা ওয়েস্ট জেনকিন্স বলেন, ‘বালোগানকে লাল কার্ড দেখানো ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেটি বহাল থাকা উচিত ছিল।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘একটি ফুটবল ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেন হস্তক্ষেপ করবেন? নিয়ম পরিবর্তন করলে পুরো খেলাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বালোগান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন জন্মসূত্রে; তার মা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় লন্ডনে ফিরতে না পেরে নিউইয়র্কে তার জন্ম দেন। সম্প্রতি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে আইনি ধাক্কা খেয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির মৌসুমি টিকিটধারী জেফ উলফ বলেন, ‘যদি ট্রাম্পের ইচ্ছায় সব চলত, তাহলে বালোগান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের হয়েই খেলতে পারতেন না। অথচ এখন তিনিই তার হয়ে কথা বলছেন।’

অনেকে আবার ফিফার সমালোচনাও করেছেন। মেইনের ৪১ বছর বয়সী লবস্টার শিকারি ম্যাট গিলি বলেছেন, ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখায়। ফিফা যদি সিদ্ধান্তটি ভুল বলে মনে করত, তবে তাদের সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।’

এ নিয়ে সোমবার ট্রাম্প নিজের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, তিনি ফিফাকে কোনো নির্দেশ দেননি। তার ভাষায়, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে ইনফান্তিনো নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটি কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।’ অন্যদিকে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত বছর ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে একটি তথাকথিত ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করেছিলেন, যা নিয়ে সে সময়ও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বলেছেন ওয়াশিংটনের স্নোহোমিশের বাসিন্দা এরিক মিলার। তিনি বলেন, বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত করার ট্রাম্প কোনো অনুচিত পদক্ষেপ নেননি। তিনি এও বলেছেন যে, যখনই কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আসে, রাজনীতিবিদরা যে তার পর্যালোচনার জন্য অনুরোধ করবেন, এতে তিনি অবাক হননি।

অন্যদিকে মেইনের পোর্টল্যান্ডে একটি বাণিজ্যিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্মের মালিক ৫০ বছর বয়সী স্টেফানি ব্রক বলেন, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ এবং এর ফলে সৃষ্ট সিদ্ধান্ত পরিবর্তন খেলাটির জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মতে, বিতর্কিত লাল কার্ডের চেয়ে সেটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাতিল হওয়াই খেলাটির জন্য আরও বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে। তবে শেষমেশ সোমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয় বেলজিয়াম।

শেয়ার করুন