যশোর শিক্ষাবোর্ডের এসএসসির ফলাফলে ক্রমাবনতি অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি থেকে সরে আসার ফলে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলের তিনটি পরীক্ষায় পাস, জিপিএ-৫ পাওয়া এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও পরীক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
যশোর শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মতিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ জমানায় পাসের হার বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হতো। তিনি বলেন, আগে বলে দেওয়া হতো পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দিতে হবে। এখন আর সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা নেই। আমরা পাসের হার বাড়াতে চাই, কিন্তু কোনো অসাধু পন্থায় নয়।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে যশোর শিক্ষাবোর্ডের ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৫-এ এবং ২০২৬ সালে তা আরও কমে হয়েছে ৩৬টি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৮৬টি কমেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯১.৪৭ শতাংশ কম। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫১৩টি, অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি বা প্রায় ৯২.৯৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল দুটি, যা ২০২৬ সালে বেড়ে হয়েছে ১১টি। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার এক পরীক্ষক জানান, আওয়ামী আমলে যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা ছিল, যা এখন নেই। ফলে যারা প্রকৃত লেখাপড়া করেছে, তাদের ফলাফল সে অনুযায়ী হয়েছে।
সোমবার ফলাফল প্রকাশের পর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী জানান, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। তিনি শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতাকে পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এবার যশোর বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২,৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন এবং পাস করতে পারেনি ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৬ সালে ফেলের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.৭৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ২৬.৩৪ শতাংশের তুলনায় ৭.৩৯ শতাংশ বেশি।
জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ২০,৭৬১ জন জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ১১,৪৭৮ জন। তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৪৪.৭২ শতাংশ কমেছে।
শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যশোর ও সাতক্ষীরার চারটি করে, খুলনার দুটি এবং বাগেরহাটের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যশোরের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শা উপজেলার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল। সাতক্ষীরার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সাতক্ষীরা নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল এবং সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চবিদ্যালয় এবং বাগেরহাটের ডিএন একতা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়েও শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। যশোর শহরের এক শিক্ষক ও পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগের দেড় দশকের ফলাফল ছিল প্রহসন, বর্তমান ফলাফলই আসল চিত্রের প্রকাশ।
বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন। সে হিসাবে পাস করতে পারেনি ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৫ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেলের হার বেড়েছে।





