হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গহিন অরণ্যে বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখি তুষার-ভ্রু চটকের দেখা মিলেছে। ২০১৮ সালের ৬ মার্চ এই বিরল পাখির দেখা পাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান। সকাল ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টাওয়ারে কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখির ছবি তুলে ডরমিটরিতে ফিরলাম। পরের ৩৭ মিনিটে সাতটি পাখির দেখা পেলাম, যার পাঁচটিই ছিল আমার জন্য নতুন এবং বিরল ও দুর্লভ তো বটেই। তবে এই ৭টি পাখির মধ্যে বেলা ৩টা ৬ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে চমৎকার স্বরে গান গাইতে গাইতে তুষারের মতো শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রুওয়ালা যে নীল-কমলা পাখিটি বেরিয়ে এল, ওর কথা কখনো ভুলতে পারব না। স্ত্রী পাখিটির দেখা পেতে একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রুর নীল-কমলা পাখিটি এ দেশের বিরল পরিযায়ী তুষার–ভ্রু চটক। গাইড প্রসেনজিৎ দেববর্মা ও পক্ষী আলোকচিত্রী ডা. শাহেনশাহ বাপ্পির সঙ্গে বনের ভেতরে অবস্থিত একটি ছোট পুকুরের পাড়ে গিয়ে পাখিটির দেখা পাওয়া যায়। বন বিভাগ শীতে বন্য প্রাণীদের পানির চাহিদা মেটাতে এই পুকুরের ব্যবস্থা করেছে।
তুষার-ভ্রু চটক বা স্নোয়ি-ব্রাউড ফ্লাইক্যাচার (বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula hyperythra) মূলত Muscicapidae গোত্রের পাখি। এটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। শীতে এদের সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে এবং কদাচ ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের পাতাঝরা বনে বিচরণ করতে দেখা যায়। পাখিটি দৈর্ঘ্যে মাত্র ১১ সেন্টিমিটার এবং ওজনে ৯ গ্রাম হয়ে থাকে। এদের প্রধান খাবার কীটপতঙ্গ, কেঁচো ও ছোট ফল।
তুষার-ভ্রু চটকের পুরুষ ও স্ত্রী পাখির চেহারায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের ওপরটা ধূসরে-নীল ও নিচটা লালচে-কমলা হয়, যার ভ্রুরেখা হয় প্রশস্ত ও ধবধবে সাদা। অন্যদিকে স্ত্রী পাখির ওপরের অংশ জলপাই-বাদামি এবং বুক ঘিয়ে-সাদা রঙের হয়। এদের চোখ বাদামি, ঠোঁট কালো এবং পা নীলচে-কালো বা ধূসর বর্ণের হয়ে থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিদের গায়ে হলদে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।
এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এ সময় তারা পাহাড়ের ঢালে পাথরের খাঁজে কিংবা গাছের গোড়ায় কাপের মতো বাসা তৈরি করে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই মিলে ডিমে তা দেয় এবং ছানা লালন-পালন করে। সাধারণত এরা একাকী বা জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে। আর্দ্র ঘন জঙ্গলের নিচু ঝোপঝাড় ও বাঁশবনে এদের বিচরণ বেশি। এদের আয়ুষ্কাল সাধারণত ২-৩ বছর হলেও ৮-৯ বছর পর্যন্ত বাঁচার রেকর্ড পাওয়া গেছে।





