অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাত হিসেবে পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসাকে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬’। এই ভিত্তিগুলো হলো—বৈধ আমদানি, ডিজিটাল হিসাব, মজুতের নিবন্ধন, কর-শুল্কে স্বচ্ছতা এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই নীতিমালা কার্যকর হলে স্বর্ণ খাতের কয়েক দশকের অস্বচ্ছতা দূর হবে, রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং চোরাচালান অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে খসড়া নীতিমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অংশীজনদের আগামী রবিবারের মধ্যে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মতামতগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুতই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
খসড়া নীতিমালায় বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের প্রতিটি ধাপ নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা স্বর্ণের উৎস, মজুত, বিক্রি ও ব্যবহারের তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়া লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মান নিয়ন্ত্রণ, হলমার্কিং, মূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলা এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, স্বর্ণ খাতকে দেশের অন্য শিল্পের মতোই পরিচালিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অস্বাভাবিক কম হলে তা চোরাচালানের বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। তাই শুল্ক ও কর নির্ধারণের সময় দুবাইসহ আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের মূল্যকে বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, যৌক্তিক শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ তৈরি হলে দেশীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রতিযোগিতামূলক গহনা তৈরি করতে পারবেন। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের নতুন খাত তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণালংকার রপ্তানিতে ভারত, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইতালির মতো দেশগুলো বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, দেশে স্বর্ণের দাম ভরিতে ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, সেদিন ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বেড়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছিল।
অন্যদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল সচিবালয়ে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার লক্ষ্যে বাণিজ্য আলোচনা সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষা, কৃষি, পশুসম্পদ এবং বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি শিক্ষা, ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।





