রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ আজ বা কাল, স্পিকার ফিরছেন আজ

প্রকাশ:

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ বা কাল পদত্যাগ করতে পারেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তাঁর বিদায়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে, চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে থাকা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই আজ শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরছেন। স্পিকারের এই আগাম দেশে ফেরার খবর রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের গুঞ্জনকে আরও জোরদার করেছে, কারণ নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল রাত ১০টা ২৩ মিনিটে এক খবরে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার পদত্যাগ করবেন। তিনটি সূত্র রয়টার্সকে এই তথ্য জানালেও সংবেদনশীলতার কারণে তারা পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই তৎপরতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ আজ শুক্রবার বিকেল বা আগামীকাল শনিবারের মধ্যেই হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোন নম্বরে কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

গতকাল দিনভর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর বিভিন্ন মহলে আলোচিত ছিল। বিএনপির নেতাদের মধ্যেও এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়া ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। তবে, রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের ব্যাপারে মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং স্পিকার দেশে ফেরার পর তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।

সরকার-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পদত্যাগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সম্প্রতি বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির জন্য তাঁর শুক্রবার পর্যন্ত সময় প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের আলোচনায় রয়েছে। তাই আজ বিকেল বা আগামীকাল শনিবারের মধ্যে সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে গতকাল আলোচনা জোরদার হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গিয়েছিলেন। তাঁর সফরসূচি অনুযায়ী ২৬ জুলাই রোববার দেশে ফেরার কথা থাকলেও তিনি আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরছেন।

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই নির্বাচিত হওয়ার কথা।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে প্রস্তুতি চলছে। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম আলোচিত হলেও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। গত দুই দিনে বিএনপির অন্তত পাঁচজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিবেদক, যাঁরা মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকেন। তাঁদের দাবি, এ বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না।

এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাই অবগত নন বলে জানা গেছে; এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কিছুটা উসখুসও রয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় ছিল। তবে হঠাৎ করেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ সচিব এবং একজন সাবেক সচিবের নামও আলোচনায় এসেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন—এমন আলোচনার মধ্যে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে অথবা স্বাস্থ্যগত কারণে যেকোনো কারণে চাইলে তাঁর সে অপশন আছে; কিন্তু আমরা তো জানি না।’ সরকারের কোনো পদক্ষেপ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই এখানে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে তো আর কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখছেন যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ইত্যাদি। আমিও শুনছি। যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে হোক, যেকোনো কারণে হোক পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো ওনার আছেই। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। আমিও এগুলো পত্রিকায় শুনছি (দেখছি)। আর তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান সাংবিধানিকভাবে, সেটা মাননীয় স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে হয়। এটুকু জানি। এর বাইরে কিছু জানি না।’

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৮ সালের এপ্রিলে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তবে, ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছিল। রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলে গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।

সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে আওয়ামী লীগের সময়েই নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। তাঁকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা মিলে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম গতকাল জামালপুরে এক কর্মসূচিতে বক্তৃতায় সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার দাবি করেছেন। এনসিপি জুলাই পদযাত্রা শেষে পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় নাহিদ বলেন, ‘এত দিন পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করতে মন চাচ্ছে। পাঁচ মাসে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারেনি বিএনপি। যে সরকার আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারেনি, তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিবর্তন করবে? শুধু পদত্যাগ করলে হবে না, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হবে।’ এ সময় নাহিদ যোগ্য, নিরপেক্ষ ও অভিভাবকসুলভ একজনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন