শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ:

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে এমন এক সংবেদনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর যেকোনো পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র পাল্টা বিক্ষোভের সম্ভাবনা রয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হতে পারে।

আইনি জটিলতার দিক থেকে হাসিনার পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। হাসিনা মনে করছেন, তার উপস্থিতি দলটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের মতো উত্তরসূরিদের জন্য পথ সুগম করবে। তিনি নিজেকে এমন নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, যিনি দেশে বিচার মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। তবে তাকে কারারুদ্ধ করা হলে তিনি সমর্থকদের কাছে ‘রাজনৈতিক শহীদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন, যা দেশে ব্যাপক জন-অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

সরকার যদি বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা নমনীয়তা দেখায়, তবে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবার এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। তারা এই বিচারকে আপসহীন বিষয় হিসেবে দেখে। এদিকে, হাসিনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান কেবল হাসিনার ফেরার ওপর নির্ভর করে না; দলটিকে বিগত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতি ও হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করতে হবে। অনেক বাংলাদেশীর কাছে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে জবাবদিহিতার সাথে বেশি সম্পৃক্ত। জুলাই ও আগস্টে নিহতদের পরিবার এবং আন্দোলনকারীরা হাসিনার প্রত্যাবর্তনের চেয়ে ন্যায়বিচারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিএনপিও এখন ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। যদিও সরকার আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে, তবুও কেউ কেউ মনে করেন, দল নয় বরং ভোটাররাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত।

শেষ পর্যন্ত হাসিনার এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, তার ফেরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে।

শেয়ার করুন