জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে স্মার্টফোনের ভূমিকা নিয়ে নতুন গবেষণা

প্রকাশ:

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে জন্মহার দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে প্রজনন হার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১-এর নিচে নেমে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, গ্রিস, পর্তুগাল, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে এই চিত্র বিশেষভাবে স্পষ্ট। এই পরিবর্তনের পেছনে স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন জন্মহার স্থিতিশীল থাকলেও ২০০৭ সালের পর থেকে তা দ্রুত কমতে শুরু করে। কাকতালীয়ভাবে ওই বছরই অ্যাপল প্রথম আইফোন বাজারে আনে। গবেষণার দুই গবেষক ক্যাটলিন কে. মায়ার্স ও ইজেকিয়েল হুপার মনে করেন, স্মার্টফোন মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের ধরনে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যার মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের গর্ভধারণের হার হ্রাসের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আইফোনের ব্যবহার শুরুতে সহজলভ্য ছিল, সেখানে জন্মহারও দ্রুতগতিতে কমেছে। গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের দৈনন্দিন আচরণ বদলে দিচ্ছে। আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুজয় দাশগুপ্ত জানান, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি, দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে মনোযোগ থাকা এবং ডেটিং অ্যাপের আধিক্যের কারণে সামনাসামনি সময় কাটানোর প্রবণতা কমে গেছে। মানসিক ক্লান্তিও অনেকের যৌনজীবনের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

ডা. দাশগুপ্ত আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণের কারণে পুরুষের শুক্রাণুর ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো অপ্রতুল। এছাড়া স্মার্টফোন সরাসরি জন্মনিয়ন্ত্রণের কারণ—এমন কোনো তথ্য নেই, তবে এটি পরোক্ষভাবে বিয়ে ও পরিবার পরিকল্পনার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার ফলে তরুণ-তরুণীরা প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ যৌনতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় কিশোরী গর্ভধারণের হারও কমছে।

বর্তমানে চাকরির অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে অনেকেই ‘ডিঙ্ক’ (উভয়েই চাকরিজীবী কিন্তু সন্তানহীন) জীবনধারা বেছে নিচ্ছেন। ভারতেও জন্মহার হ্রাসের প্রবণতা স্পষ্ট, যেখানে মোট প্রজনন হার প্রায় ১.৯। ২০১৬ সালে ৪জি ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের দ্রুত বিস্তারের পর ভারতেও এই হার কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু স্মার্টফোন নয়; বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নগরায়ণ, শিক্ষা ও দেরিতে বিয়ের মতো বহুমুখী সামাজিক পরিবর্তনের কারণেই বিশ্বজুড়ে জন্মহারের এই নিম্নমুখী ধারা তৈরি হয়েছে।

একইভাবে, স্মার্টফোনকে জন্মনিয়ন্ত্রণের সরাসরি কারণ বলেও কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।ইন্টারনেট ও বদলে যাওয়া জীবনধারাবিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরী গর্ভধারণের হারও দ্রুত কমেছে।

শেয়ার করুন