গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হওয়া যে অনেক উঁচু থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে শরীর কেঁপে উঠে ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে যাওয়া—এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই আকস্মিক ঝাঁকুনিকে বলা হয় ‘হিপনিক জার্ক’। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজার মতে, জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমের জগতে প্রবেশের সময় শরীরের কোনো অংশ বা পুরো শরীরে যে অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচন ঘটে, তা-ই হিপনিক জার্ক। অনেক ক্ষেত্রে এর সাথে উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো সংবেদন বা আচমকা চমকে ওঠার মতো বিষয় জড়িয়ে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৭ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
ঘুমের প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে শরীর যখন ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে, তখনই সাধারণত হিপনিক জার্ক দেখা দেয়। মস্তিষ্ক ও পেশীর মধ্যে সাময়িক সমন্বয়হীনতার কারণে এই ঝাঁকুনি তৈরি হতে পারে। ঘুমের পর্যায়গুলোর মধ্যে নন-র্যাপিড আই মুভমেন্টের এন-১ এবং এন-২ পর্যায়েই এটি বেশি ঘটে। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ এই অভিজ্ঞতার শিকার হন। মার্কিন ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের তথ্য অনুযায়ী, এটি সাধারণত কোনো রোগের লক্ষণ নয়, তবে বারবার ঘটতে থাকলে তা স্নায়বিক রোগ, মৃগীরোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ সমস্যা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
হিপনিক জার্ক হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় পাওয়া না গেলেও কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়। এর মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্যাফেইন বা কফি গ্রহণ, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ অন্যতম। বিশেষ করে অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মস্তিষ্ককে পুরোপুরি শিথিল হতে দেয় না এবং ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যদি এই ঝাঁকুনি প্রায় প্রতিদিন বা ঘন ঘন হতে থাকে, ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া, খিঁচুনি, শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা বা তীব্র নাক ডাকা, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রস্রাব হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দ্রুত একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডা. সিন্ধুজার মতে, এসব উপসর্গ মৃগীরোগ বা ডিমেনশিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে, তাই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।




