সন্তানহারা বাবা-মায়ের হাহাকার: হামে কেড়ে নিল অগণিত প্রাণ

প্রকাশ:

বিয়ের ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির ঘরে এসেছিল প্রথম সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিম। টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া এই শিশুর জন্মদিন ছিল ৪ আগস্ট। তবে ৮ মাস ১৮ দিন বয়সেই হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২২ এপ্রিল সে মারা যায়। তাজিমের মা ফারজানা ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, হামে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। সন্তানহারা বাবা-মা হিসেবে বাধ্য হয়েই তারা বেঁচে আছেন। তাজিমের জন্য প্রথম ডোজ টিকার তারিখ ছিল ১ মে, কিন্তু তার আগেই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পিআইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। গত মার্চ থেকে তাজিমের চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন তারা, শুধু হামের চিকিৎসাতেই ১৭ দিনে চার লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

একই চিত্র ৪ বছর ৩ মাস বয়সী আকিরা হায়দার আরশির ক্ষেত্রেও। গত ২ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুরের ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের পিআইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। আকিরার মা সানজিদা হক জানান, মেয়ের হার্টে ছিদ্র থাকায় সময়মতো হামের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকা নিতে গেলেও কেন্দ্রের সংকটের কারণে তা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ২৭ দিন নিউমোনিয়া ও হামের বিরুদ্ধে লড়াই করে আকিরা মারা যায়। তার বাবা আল আমিন ফেসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছেন, যে বয়সে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে মেয়ের মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে।

হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসার বেহাল দশা ও সঠিক সেবার অভাব নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ দীর্ঘ। গত ২৩ এপ্রিল সাইনবোর্ড মোড়ের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে ৮ মাস বয়সী ফাতেমা মারা যায়। একই হাসপাতালে ৩৬ দিন চিকিৎসাধীন ছিল তার যমজ বোন খাদিজা, যে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাদের নানি সোনিয়া আক্তার জানান, হাসপাতালগুলোতে সিট, অক্সিজেন বা পিআইসিইউ না থাকায় তাদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে। সায়মা বেগমের বড় মেয়ে তিন বছর বয়সী আয়েশাও বিভিন্ন জটিলতায় বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে।

রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের ৮ মাস বয়সী মাহির, ৯ মাস বয়সী খুশবু, এক বছরের বেশি বয়সী আরিশা, ৩ মাস ১৮ দিন বয়সী মুনা ও ৫ মাস বয়সী মেহেদিও চলতি বছর হাম ও হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে। ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন এসব শিশুর মৃত্যুর পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাদের দাফন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে নিবাসে নতুন শিশু এলে তাদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যদিও সংক্রামক রোগ থেকে শিশুদের রক্ষা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

শেয়ার করুন