মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। তবুও বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে আটকে আছে। এর মূল কারণ হিসেবে সরবরাহ হ্রাসের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদাও কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো দেশগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি দামের ঊর্ধ্বগতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হচ্ছে, যা সাত মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর দিকে ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়, আগস্টের শেষ সপ্তাহে সংঘাত শুরুর আগে এই পথে দিনে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো, যা পরে ২০ লাখের নিচে নেমে আসে। তবে বর্তমানে দৈনিক গড় হিসাবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কে-প্লারের তথ্যমতে, ২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বড় কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হতে দেখা যায়নি, যদিও শিল্প সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে।
সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ও জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কৌশল অবলম্বন করছে। সৌদি আরামকো আগস্টে রাস তানুরা বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাড়ালেও ইয়েমেনের হুতিদের নৌ অবরোধের কারণে লোহিত সাগরের ইয়ানবুর রপ্তানি আগস্টে গড়ে ১৪ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা আগের তিন মাসে ছিল ৩৯ লাখ ব্যারেল। অন্যদিকে মিসরের সিদি কেরি বন্দর দিয়ে আগস্টে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২১ লাখ ৩৯ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। এছাড়া ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের রপ্তানিও স্থিতিশীল রয়েছে। ওপেকের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানাসহ কয়েকটি দেশ এ বছর সম্মিলিতভাবে দিনে আরও ১৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়াবে বলে রিস্টাড এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা জারান্ড রিস্টাড জানিয়েছেন। রাশিয়ার রপ্তানি বর্তমানে দিনে ৫৫ লাখ ব্যারেলে স্থির থাকলেও ভবিষ্যতের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে তাদের উৎপাদন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে।
চাহিদার দিক থেকে দেখা গেছে, পেট্রোকেমিক্যাল ও পরিবহন জ্বালানিতে ব্যবহার কমে যাওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা দিনে ৩৫ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ চীনে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক শিল্পের প্রসারের কারণে তেলনির্ভর জ্বালানির চাহিদা কমেছে। চীনের মজুত ভাণ্ডারে বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি ব্যারেল তেল থাকায় সরবরাহ সংকটের তাৎক্ষণিক চাপ দেশটিতে কম।
তবে স্পট মার্কেটের পরিস্থিতি ভিন্ন এবং বেশ সংকটজনক। নভেম্বরের সরবরাহের জন্য দুবাই ও ওমানের তেলের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১৯ থেকে ২০ ডলার বেশি। সোমবার ওমানের ফিউচার্সের দাম ছিল ১০৪ দশমিক ৫৪ ডলার এবং দুবাইয়ের স্পট মার্কেটে দাম ছিল ১০৫ দশমিক ১০ ডলার। আর্গাসের অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং ডিজেলের বাজারেও ঘাটতির আশঙ্কা বাড়ছে। মরগ্যান স্ট্যানলি ও গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বজায় থাকলে ভবিষ্যতে তেলের দাম বাড়তে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দামের পূর্বাভাস ৫ ডলার করে বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বিকল্প পথে রপ্তানি ও চাহিদা হ্রাসের কারণে দাম ১০০ ডলারের নিচে থাকলেও স্পট মার্কেট ও ডিজেলের বাজারের সংকট নির্দেশ করছে যে পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।





