গুমের ঘটনায় তদন্ত: বিল সংশোধনের দাবি মানবাধিকারকর্মীদের

প্রকাশ:

গুমসংক্রান্ত দুটি প্রস্তাবিত বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীকেই দেওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্যরা। তাঁরা বলেছেন, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ না থাকলে গুমের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহিতা আরও কঠিন হবে। বিল দুটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নিজের বিচার নিজে করার সুযোগ থাকলে তা হবে একরকমের ধোঁকা।

আজ শনিবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে 'গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে' আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এই সভার আয়োজন করে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন সভায় মত দেন যে, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ—উভয় আইনেই স্বতন্ত্র তদন্তপ্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তদন্তের প্রক্রিয়া পরিবর্তন না হলে এটি সবাইকে ধোঁকা দেওয়ার শামিল হবে, কারণ নিজের বিচার নিজে করা যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিবেশী কোনো দেশেই এমন ব্যবস্থা নেই। সারা হোসেন বলেন, এখন সংসদের স্থায়ী কমিটি আইন দুটি নিয়ে কী করবে এবং বিশেষজ্ঞরা মতামত কতটা আমলে নেবেন, সেটাই বড় পরীক্ষা। আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের আদালত তো ব্যর্থ হয়েছে। আদালতের কাছে প্রায় কেউই যেতে পারেনি।…যাঁরা গেছেন তাঁরা কিন্তু কোনো ধরনের সুরাহা সেখান থেকে পাননি।’ তিনি সরকারকে প্রশ্ন করেন, ‘এটা সরকারের জন্যও বড় পরীক্ষা যে তারা আগের মতোই নীরবতা পালন করবেন? আদালতকে কোনো ধারণা দেবেন না…তারা কি পুরা প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করবেন? নাকি সেখানে এসে তারা একটা জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করে দেবেন প্রথমবারের মতো।’

গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, যদি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত গুমের ঘটনা তদন্তের কার্যকর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে এমন আইন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এত পয়সাকড়ি খরচ করে আমরা পাঁচজন কমিশনারকে পালব, গাড়ি দেব, সিকিউরিটি দেব, অফিস দেব, কোনো দরকার নেই।’ নূর খান আরও বলেন, প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে; শুধু বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া বা তাদের মাধ্যমে অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রেখে কমিশনকে নির্ভরশীল করে রাখলে কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত হবে না।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ভুক্তভোগী মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, বর্তমান সংসদ হলো মজলুমদের মিলনমেলা। তাঁর মতে, গত ১৭ বছরে এমন কোনো সংসদ সদস্য নেই, যিনি বা তাঁর পরিবার অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হননি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সেই মজলুমদের হাত দিয়ে এমন একটি আইন পাস হতে চলেছে, যা গুমের পথকে সুগম করবে।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, বলা হয় যে নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধার্থে আইনগুলো সেভাবে করা হচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীরাই তো এই জিনিসগুলো করে। তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাঁদের কাজ নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা। শহিদুল আলম বলেন, ‘সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে…নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা আপনাদের কাজ না, আপনাদের নিজের স্বার্থ দেখা আপনাদের কাজ না; জনগণ যারা আপনাদের এনেছে, তাদের স্বার্থেই আপনাদের কাজ করার কথা।’

সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, “আমরা তো গুম করব না, তাহলে এত চিন্তা কেন?” যদি গুম না–ই করবেন, তাহলে দরজাটা খোলা রাখছেন কেন? যদি দরজা খোলা থাকে, কেউ না কেউ সে দরজা দিয়ে একসময় ঢুকবে।’

সভায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁরা গুমের শিকার ব্যক্তিদের খোঁজ চান এবং গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। এ সময় সম্প্রতি মোংলায় কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ থাকা মিরাজ শেখের খোঁজ চান তাঁর বোন লিজা ইসলাম।

সভায় এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: মোংলায় সম্ভাব্য গুমের শিকার মিরাজ শেখসহ আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকারদের খুঁজে বের করা; গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা; গুম কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন; অতীতের গুমের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিরোধ আইন সংশোধন করা; গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারকে সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনতা দেওয়া।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। এতে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী এবং এইচসিএইচআরের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সাবরিন আহমেদ।

শেয়ার করুন