৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রীলংকায় ৫৭২ জনের হাড়গোড় উদ্ধার: দীর্ঘদিনের বিচারহীনতায় স্বজনদের হাহাকার

প্রকাশ:

শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখান থেকে শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জন মানুষের হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময়কার নৃশংসতার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে এই আবিষ্কারের মাধ্যমে। এর আগে একজন সেনাসদস্য, যাকে একজন তরুণীকে নির্যাতন ও হত্যার দায়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তিনি এমন একটি স্থানের কথা জানিয়েছিলেন যেখানে শত শত মানুষের দেহাবশেষ রয়েছে। এই ঘটনাটি ফের নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শ্রীলংকার দীর্ঘদিনের সংঘাতময় ইতিহাস এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিষয়গুলো নিয়ে।

শ্রীলংকায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ দেশটিকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করেছিল। সে সময় জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে তামিল টাইগার বা লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই চলে। ১৯৯৫ সালে সেনাবাহিনী এলাকাটি পুনর্দখল করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। মোট ২৬ বছরের এই সংঘাতের ইতিহাসে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সাথে নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ২৩ হাজার মানুষ, যাদের সিংহভাগই তামিল সম্প্রদায়ের। নিরাপত্তা বাহিনী এবং তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধকালীন অপরাধ ও নৃশংসতার অভিযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরে তামিলদের দাবি ছিল, সিংহলী-প্রধান সরকার তাদের প্রতি ধারাবাহিকভাবে বৈষম্য চালিয়ে আসছে।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা এক মা বলেন, ‘সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তার কথা মনে করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।’ পরিবারের সদস্যদের এই হাহাকার আর বিচার পাওয়ার আকুতি শ্রীলংকার অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক করুণ বাস্তবতা। দীর্ঘ চাপের মুখে ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের জন্য ‘অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স’ (ওএমপি) নামক একটি স্বাধীন সংস্থা গঠন করে। তবে এখনো অনেক পরিবারই অতীতের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর হতাশ।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, গুম, নির্যাতন ও হত্যার অসংখ্য মামলা এখনো স্থবির হয়ে আছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য এবং মানবাধিকারকর্মীরা প্রায়ই হুমকি ও ভয়ের পরিবেশের মুখোমুখি হন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীরা কয়েক দশক ধরে যে বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতিটা এমন যে তারা অতীতের যেকোনো তদন্তের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক সহায়তা যুক্ত হলে এসব তদন্তে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরতে পারে।’

তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা নিরসনে কাজ চলছে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে, যা সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ আদালতে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে শ্রীলংকার প্রতিটি সরকারই গৃহযুদ্ধকালীন নৃশংসতার তদন্তে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। স্থানীয়ভাবে গঠিত তদন্ত সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে বরাবরই অধিকার গোষ্ঠীগুলো সমালোচনা করে আসছে। এখন এই গণকবর থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৭২ জনের পরিচয় শনাক্ত এবং তাদের মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত দায়ীদের খুঁজে বের করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি পরিকল্পিতভাবে খুঁড়ে তোলা কোনও কবরস্থান ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে সময় জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়াতে খননকাজ করছিলেন শ্রমিকরা, আর তখনই তারা সেখানে হঠাৎ মানব দেহাবশেষ খুঁজে পেতে শুরু করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়; যেমন: চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে কিছু গুঞ্জন ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সেখানকার মরদেহগুলো নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষদের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গণকবরের এই স্ন্ধান বিপর্যয়কর হলেও এটি জেয়ারুবি জেয়াবালানের মতো মানুষের মনে নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারে আশার সঞ্চার করেছে।

শেয়ার করুন