লোকসানে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আর্থিক সংকটের বোঝা এবার সোনালী ব্যাংকের ওপর এসে পড়েছে। সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের বড় অংশ দীর্ঘদিনেও আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। এসব ঋণের বিপরীতে সরকারের দেওয়া গ্যারান্টির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে সোনালী ব্যাংক। এই পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে ব্যাংকটি। একইসঙ্গে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের ওপর চাপ কমাতে বকেয়া ঋণের বিপরীতে সরকারি বন্ড ইস্যু অথবা নতুন করে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট অর্থ বিভাগের সচিবকে লেখা এক চিঠিতে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানান, অনাদায়ী ঋণের বিপরীতে উচ্চ হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এতে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বিপুল পরিমাণে বাড়বে এবং ব্যাংকের মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জানা গেছে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এবং এর অধীন ৯টি চিনিকলকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩,১০৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। শুধু বিএসএফআইসির অনুকূলে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির পাওনা রয়েছে ২,৭৬২ কোটি টাকা। দীর্ঘদিনের বকেয়া সুদ ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৭,১৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫৩ কোটি টাকা পরিশোধের পর নিট বকেয়া রয়েছে ৬,৯৩৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিএসএফআইসির অনুকূলে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে ১,০০০ কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টি ছিল, যার মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। এর আগে বিএসএফআইসি ও চিনিশিল্পের ঋণের বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের অনুকূলে ইস্যু করা মোট ৬টি সরকারি গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব গ্যারান্টির মেয়াদও শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণগুলো নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। চিনিকলগুলোর ঋণের একটি অংশ বিএসএফআইসি, সংশ্লিষ্ট চিনিকল এবং সোনালী ব্যাংকের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে মঞ্জুর ও বিতরণ করা হয়। সরকারি গ্যারান্টি ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি থাকায় এতদিন হিসাবগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও অশ্রেণিকৃত রাখা হয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকে এসব ঋণ আবার শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে সোনালী ব্যাংক।
ঋণখেলাপি হওয়া ঠেকাতে সোনালী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকটি বিএসএফআইসি ও এর আওতাধীন চিনিকলগুলোর ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করে অবশিষ্ট আদায়যোগ্য অর্থের বিপরীতে সরকারি বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিতে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানায়। একই বছরের ১৩ এপ্রিল অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসএফআইসি ও সোনালী ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, তবে ওই সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ব্যাংকটিকে কিছু জানানো হয়নি। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি, ২৬ এপ্রিল এবং সবশেষে ১৯ আগস্ট আবারও অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়ে সরকারি গ্যারান্টি অথবা বকেয়া অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়। সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির (অ্যালকো) সভাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনেও ব্যাংকটিকে একক ঋণগ্রহীতার নির্ধারিত ঋণসীমা বা সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট অতিক্রমকারী ঋণগুলো সমন্বয়ের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
বিএসএফআইসির আওতায় থাকা ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ২০২০ সালে ৬টি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে চালু থাকা ৯টি চিনিকলের অধিকাংশই লোকসানে রয়েছে। বিএসএফআইসির কর্মকর্তাদের দাবি, চিনিকলগুলোর উৎপাদন মূল্য ও সরকার নির্ধারিত মূল্যের পার্থক্যের কারণে ট্রেড গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। ট্রেড গ্যাপ ও ভর্তুকি বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের কাছে বিএসএফআইসির পাওনা ৮,০৪১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি পাওয়া গেলে এ ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতো না বলে তারা জানান। এ বিষয়ে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান সুরুজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অফিসে গিয়ে কথা বলতে বলেন, তবে পরে তার অফিসে গিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।





